অপেক্ষার শেষ স্টেশন
জামিনুর ইসলাম
শহরের ব্যস্ত রেলস্টেশন। চারদিকে মানুষের হুড়োহুড়ি, ট্রেনের বাঁশি আর হকারদের চিৎকার। এই শোরগোলের মাঝেও প্ল্যাটফর্মের এক কোণে পাথরের বেঞ্চিতে স্থাণুর মতো বসে আছেন সুমন সাহেব। তাঁর পরনে ইস্ত্রি করা ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি, হাতে একটি পুরোনো চামড়ার ব্যাগ।
গত দশ বছর ধরে প্রতি শুক্রবার বিকেলে তিনি এখানে আসেন। স্টেশনের মাস্টার থেকে শুরু করে ঝালমুড়ি বিক্রেতা—সবাই তাঁকে চেনে। কেউ কেউ আড়ালে হাসাহাসি করে বলে, “পাগল বুড়ো!” কিন্তু সুমনের সেদিকে খেয়াল নেই। তাঁর চোখজোড়া নিবদ্ধ থাকে ঠিক পাঁচটার লোকাল ট্রেনের দিকে।
দশ বছর আগে এই স্টেশনেই তাঁর হাত ছেড়ে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল একমাত্র ছেলে বক্কর। বড় অভিমানী ছিল ছেলেটা। সামান্য কথা-কাটাকাটির জেরে ঘর ছেড়েছিল সে। যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল, “আর কোনোদিন ফিরব না।”
আজ ট্রেনের কামরা থেকে একে একে সবাই নেমে গেল। ভিড় পাতলা হয়ে এল। সুমন বরাবরের মতো উঠে দাঁড়ালেন। ঝাপসা চোখে শেষ কামরাটার দিকে তাকালেন। হঠাৎ দেখলেন, একটি চেনা অবয়ব ট্রেনের দরজা ধরে থমকে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক বক্করের মতো চিবুক, সেই একই রকম উসকোখুসকো চুল।
ছেলেটি কাছে এগিয়ে এসে নিচু স্বরে ডাকল, “বাবা?”
সুমনের ঠোঁট দুটো থরথর করে কেঁপে উঠল। চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল তপ্ত জল। তিনি কোনো অভিযোগ করলেন না; শুধু কাঁপা হাতে ছেলের কাঁধ ছুঁয়ে বললেন, “বড্ড দেরি করলি রে খোকা! চল, তোর মা পথ চেয়ে বসে আছে।”
অস্তগামী সূর্যের আলোয় স্টেশনের দীর্ঘ ছায়াগুলো মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। আজ আর ব্যাগটা হাতে নয়, ছেলের কাঁধে। এক দশক পর একজোড়া ছায়া স্টেশনের বাইরে বেরোনোর পথ ধরল।
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন