“যে মানুষটাকে মৃত জেনে মেহরীন পাঁচ বছর কেঁদেছে, সে যদি সত্যিই বেঁচে থাকে—তাহলে কবরের নিচে শুয়ে আছে কে?
আর সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্ন—মেহরীনের বাবা যদি সত্যিই মৃত হন, তাহলে এই মুহূর্তে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি কে?”
পর্ব ৩
মেহরীনের নিঃশ্বাস আটকে গেল।
অন্ধকার স্টেশনের ক্ষীণ আলোয় মানুষটার মুখটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সেই মুখ।
সেই চোখ।
কপালের ডান পাশে ছোট্ট দাগটাও একই।
ভুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এটা তার বাবা।
মেহরীন এক পা পিছিয়ে গেল।
—বাবা…?
মানুষটা কোনো উত্তর দিল না।
শুধু স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
মেহরীনের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল।
তার বাবা মারা যাওয়ার দিনটা তার স্পষ্ট মনে আছে।
হাসপাতালের সাদা বিছানা।
অক্সিজেনের মাস্ক।
শেষবার বাবার কাঁপা হাতটা নিজের হাতে ধরে রাখা।
আর তারপর…
ডাক্তারের সেই কথাটা—
“আমরা দুঃখিত।”
তাহলে আজ?
তার সামনে কে দাঁড়িয়ে?
মেহরীন কাঁপা গলায় আবার বলল,
—আপনি… আমার বাবা নন।
লোকটার ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটল।
—এতদিন পরেও চিনতে পারলে না?
মেহরীনের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
এই কণ্ঠস্বর…
কণ্ঠটা তার বাবার মতো নয়।
বরং আরও পরিচিত।
কোথায় যেন শুনেছে সে।
হঠাৎ তার মাথায় একটা নাম ঝলকে উঠল।
নাভিদ।
মেহরীন আতঙ্কে পেছনে সরে গেল।
—তুমি কে?
লোকটা এবার এক পা এগিয়ে এল।
—এই প্রশ্নটা তোমার আমাকে নয়, নিজেকেই করা উচিত।
—আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
—বুঝবে।
লোকটা পকেট থেকে একটা ছোট্ট খাম বের করল।
মেহরীনের দিকে বাড়িয়ে দিল।
—এটা তোমার জন্য।
মেহরীন খামটা নিল না।
—এটার ভেতরে কী?
—যে সত্যের জন্য তুমি পাঁচ বছর অপেক্ষা করেছ।
মেহরীন ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে খামটা নিল।
খামের ওপর লেখা—
“চিঠি—২”
তার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।
প্রথম চিঠিটা ছিল নাভিদের নামে।
এটা দ্বিতীয় চিঠি।
কিন্তু কে লিখেছে?
সে খামটা খুলতে যাবে, ঠিক তখনই স্টেশনের বাইরে হঠাৎ গাড়ির শব্দ হলো।
লোকটা মুহূর্তেই বদলে গেল।
তার মুখের হাসি উধাও।
সে চারদিকে তাকাল।
—ওরা এসে গেছে।
মেহরীন ফিসফিস করে বলল,
—কারা?
লোকটা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—যাদের কাছ থেকে তোমাকে এতদিন লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।
—কে আমাকে লুকিয়ে রেখেছিল?
লোকটা উত্তর দিল না।
বরং দ্রুত মেহরীনের হাত ধরে তাকে স্টেশনের পুরোনো দেয়ালের পাশে টেনে নিয়ে গেল।
—চুপ।
দূরে কয়েকজন মানুষের পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
একজন বলল,
—লকারটা খোলা।
আরেকজনের কণ্ঠ ভেসে এলো—
—তাহলে মেয়েটা এখানে এসেছে।
মেহরীনের বুক ধক করে উঠল।
মেয়েটা?
কাকে বলছে তারা?
তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা মেহরীনের কানে ফিসফিস করে বলল,
—তুমি যদি আজ ধরা পড়ো, তাহলে নাভিদকে আর কখনো দেখতে পাবে না।
মেহরীনের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।
—নাভিদ কোথায়?
লোকটা তার দিকে তাকাল।
—যেখানে তোমার যাওয়ার কথা ছিল পাঁচ বছর আগে।
তারপর হঠাৎ স্টেশনের আলো নিভে গেল।
চারপাশ অন্ধকার।
মেহরীন চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই কেউ তার মুখ চেপে ধরল।
একটা ফিসফিসে কণ্ঠ তার কানের কাছে—
—একদম শব্দ করবে না।
মেহরীনের শরীর জমে গেল।
কারণ সেই কণ্ঠটা…
সে এই কণ্ঠস্বর আগে শুনেছে।
অচেনা নম্বরে।
রাত ২টা ১৭ মিনিটে।
“আপনি এখনও তাকে বিশ্বাস করেন?”
মেহরীনের চোখ দিয়ে অন্ধকারে পানি গড়িয়ে পড়ল।
সে বুঝে গেল—
যে মানুষটা তাকে ফোন করেছিল, সে এখানেই আছে।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার—
সে একা নয়।
স্টেশনের অন্য প্রান্ত থেকে হঠাৎ একটা মেয়ের চিৎকার শোনা গেল।
—মেহরীনকে খুঁজে বের করো!
মেহরীনের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
কারণ কণ্ঠটা তার নিজের মতো।
হুবহু।
একই স্বর।
একই উচ্চারণ।
সে পাশে থাকা লোকটার হাত সরিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—ওই মেয়েটা কে?
লোকটা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল।
তারপর মেহরীনের হাতে থাকা দ্বিতীয় চিঠিটার দিকে তাকিয়ে বলল—
—যার জন্য তোমাকে এত বছর ধরে মিথ্যে বলা হয়েছে।
মেহরীন কাঁপা হাতে চিঠিটা খুলল।
প্রথম লাইনে লেখা—
“মেহরীন, তোমার যে বোনকে মৃত বলা হয়েছিল, সে কখনো মারা যায়নি।”
তার নিচে আরও একটি লাইন।
সেটা পড়েই মেহরীনের চোখ স্থির হয়ে গেল।
“কারণ সে এখন তোমার সবচেয়ে কাছের মানুষ।”
ঠিক তখনই অন্ধকারের ভেতর থেকে কারও পায়ের শব্দ এগিয়ে এলো।
এক পা…
দুই পা…
তিন পা…
মেহরীন মাথা তুলে তাকাল।
একজন মেয়ে ধীরে ধীরে আলোয় এসে দাঁড়াল।
মুখটা দেখা মাত্রই মেহরীনের বুকের ভেতর যেন সবকিছু থেমে গেল।
কারণ—
মেয়েটি দেখতে হুবহু মেহরীনের মতো।
চলবে…
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন