“যে মানুষটার হাতে বন্দুক, তাকে মেহরীন নাভিদ বলে চিনেছিল।
কিন্তু তার চোখের দিকে তাকাতেই মেহরীন বুঝল—এ চোখ সে আগে কখনো দেখেনি।”
পড়ব ৫
নাভিদ বন্দুকটা নিচু করল না।
মেহরীন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
মায়া তার হাত শক্ত করে ধরে আছে।
চারপাশে অন্ধকার।
দূরে কোথাও ট্রেনের হর্ন শোনা যাচ্ছে।
কিন্তু এই মুহূর্তে মেহরীনের কাছে পৃথিবীতে শুধু একজন মানুষই আছে—
নাভিদ।
পাঁচ বছর ধরে মৃত।
আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে।
কিন্তু মেহরীনের মনে হলো, এই মানুষটার মধ্যে কোথাও একটা ভয়ংকর অচেনাভাব আছে।
সে খুব ধীরে বলল,
—নাভিদ?
লোকটা কোনো উত্তর দিল না।
বরং বন্দুকের নলটা সামান্য ওপরে তুলল।
—চিঠিটা দাও।
মেহরীন চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরল।
—কোন চিঠি?
—যেটা তোমার হাতে।
—এটা কেন চাইছ?
লোকটার চোখ এবার মেহরীনের দিকে স্থির হলো।
—কারণ তুমি এটা পড়লে তোমার সবচেয়ে কাছের মানুষটাকে আর বিশ্বাস করবে না।
মেহরীনের বুক ধক করে উঠল।
—কাকে?
লোকটা মৃদু হাসল।
—সেটাই তো তোমার জানা উচিত।
মায়া হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল।
—ওর কথা বিশ্বাস কোরো না।
নাভিদের চোখ সঙ্গে সঙ্গে মায়ার দিকে গেল।
তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—তুমি এখনও বেঁচে আছ?
মায়া শান্ত গলায় বলল,
—তোমার জন্যই।
মেহরীন দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল।
—তোমরা একে অপরকে চেনো?
কেউ উত্তর দিল না।
মেহরীনের মাথার ভেতর প্রশ্নগুলো একসঙ্গে বিস্ফোরিত হতে লাগল।
নাভিদ মায়াকে চেনে।
মায়া নাভিদকে চেনে।
আর দুজনেই এমন কিছু জানে, যা মেহরীনের কাছ থেকে লুকানো হয়েছে।
সে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল,
—কেউ আমাকে বলবে কী হচ্ছে?
নাভিদ এবার ধীরে ধীরে বন্দুকটা নামিয়ে ফেলল।
—তুমি সত্যিটা জানতে চাও?
—হ্যাঁ!
—তাহলে আজ থেকে তোমার কাউকেই বিশ্বাস করা যাবে না।
মেহরীনের চোখে পানি চলে এল।
—তোমাকেও?
নাভিদ কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
—বিশেষ করে আমাকে।
মেহরীন স্তব্ধ।
নাভিদ পেছনে ফিরে যেতে শুরু করল।
মায়া তাকে থামিয়ে বলল,
—তুমি কোথাও যাবে না।
নাভিদ থামল।
—সময় শেষ হয়ে গেছে, মায়া।
—কার সময়?
নাভিদ উত্তর দিল না।
হঠাৎ তার পকেটের ফোন বেজে উঠল।
সে ফোন বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
তার মুখের রং বদলে গেল।
মেহরীন সেটা লক্ষ্য করল।
—কী হয়েছে?
নাভিদ ফোনটা বন্ধ করে ফেলল।
তারপর মেহরীনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আজ রাতের পর যদি তোমার কাছে আমার নামে আর কোনো চিঠি আসে, সেটা খুলবে না।
মেহরীন হতভম্ব হয়ে গেল।
—কেন?
—কারণ সেটা আমি লিখব না।
এই কথা বলে নাভিদ অন্ধকারের দিকে এগিয়ে গেল।
মেহরীন হঠাৎ তাকে ডাকল—
—নাভিদ!
সে থামল।
—তুমি সত্যিই বেঁচে আছ?
নাভিদ পিছনে না তাকিয়েই বলল,
—আমি পাঁচ বছর আগে মারা গিয়েছিলাম।
তারপর সে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
মেহরীন কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।
মায়া তার কাঁধে হাত রাখল।
—চলো।
—কোথায়?
—এখান থেকে।
—না।
মেহরীন চিঠিটা বের করল।
—আজ আমি সব জানতে চাই।
মায়া তার দিকে তাকাল।
—সব সত্য একসঙ্গে জানলে মানুষ বাঁচতে পারে না।
—আমি এতদিন মিথ্যার মধ্যে বেঁচেছি।
মায়া আর কিছু বলল না।
দুজনেই স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে এলো।
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
মেহরীন বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করল।
চিঠিটা টেবিলের ওপর রাখল।
তারপর ধীরে ধীরে আবার খুলল।
প্রথম পাতায় শুধু কয়েকটি লাইন ছিল।
কিন্তু এবার চিঠির ভাঁজের ভেতরে একটা ছোট্ট কাগজ দেখতে পেল।
সে কাগজটা খুলতেই হাত কেঁপে উঠল।
সেখানে লেখা—
“মেহরীন, তোমার জন্মের দিন তোমার বাবা-মা হাসপাতালে একটি সন্তান নিয়ে বাড়ি ফেরেনি। তারা ফিরেছিল দুটি সন্তান নিয়ে।”
তার নিচে—
“কিন্তু দুজনের একজনকে সেদিনই অন্য কারও হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।”
মেহরীনের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
মায়া সত্যিই তার বোন?
তাহলে তাকে আলাদা করা হয়েছিল কেন?
আর কে নিয়েছিল মায়াকে?
হঠাৎ দরজায় শব্দ হলো।
ঠক… ঠক…
মেহরীন চমকে উঠল।
—কে?
কোনো উত্তর নেই।
আবার—
ঠক… ঠক…
মেহরীন ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেল।
—মায়া?
নীরবতা।
সে দরজা খুলল।
করিডোর ফাঁকা।
কিন্তু মেঝেতে একটা খাম পড়ে আছে।
কালো খাম।
মেহরীন সেটা তুলে নিল।
খামের ওপর লেখা—
“এবার নিজের ঘরের আয়নাটা দেখো।”
মেহরীনের বুক কেঁপে উঠল।
সে ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর ফিরে তাকাল।
আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে রইল।
কয়েক সেকেন্ড পর তার চোখ আটকে গেল আয়নার এক কোণে।
তার প্রতিবিম্বের পেছনে—
আরেকজন দাঁড়িয়ে আছে।
মেহরীন ঝটকা দিয়ে পিছনে ফিরল।
কেউ নেই।
আবার আয়নার দিকে তাকাল।
এবারও কেউ নেই।
কিন্তু আয়নার নিচে একটা লেখা ফুটে উঠেছে।
লাল কালিতে।
“তুমি মায়াকে খুঁজছ কেন?
মায়া তো তোমাকেই খুঁজছে।”
মেহরীনের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।
ঠিক তখন তার ফোনে একটা ছবি এলো।
ছবিটা খুলতেই সে দেখল—
পাঁচ বছর আগের একটি হাসপাতালের ছবি।
একটি বিছানায় নাভিদ শুয়ে আছে।
তার পাশে দাঁড়িয়ে একজন ডাক্তার।
আর বিছানার নিচে ছোট্ট অক্ষরে লেখা—
“রোগী: মেহরীন।”
মেহরীনের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।
সে ছবিটা বারবার দেখল।
তারপর ফোনের নিচে আরেকটি মেসেজ এলো—
“তুমি যে রাতটাকে নাভিদের শেষ রাত মনে করেছিলে, সেই রাতে আসলে তুমি হাসপাতালে ভর্তি ছিলে।”
মেহরীনের চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এলো।
কারণ তার মনে পড়ছে না—
পাঁচ বছর আগে সে কীভাবে সেই রাত থেকে বেঁচে ফিরেছিল।
চলবে…
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন