“যাকে তুমি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করো,
হয়তো গল্পের শেষ পৃষ্ঠায় তাকেই চিনতে পারবে না।”
নাজনীন শামীম
১৯-০৮-২০২৬ইং
পর্ব ১ : অচেনা নম্বর
রাত তখন ২টা ১৭ মিনিট।
শহর ঘুমিয়ে আছে। দূরের কোনো গলিতে কুকুরের ডাক, জানালার কাঁচে মাঝেমধ্যে বাতাসের মৃদু শব্দ—সব মিলিয়ে চারপাশে এমন এক নীরবতা, যেন রাত নিজেই কোনো গোপন কথা বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে।
মেহরীন ঘুমিয়ে ছিল।
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
অন্ধকার ঘরে ফোনের আলোটা চোখে পড়তেই মেহরীন বিরক্ত হয়ে হাত বাড়াল। ঘুমজড়ানো চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখল—অচেনা একটি নম্বর।
এত রাতে কে ফোন করবে?
এক মুহূর্ত ইতস্তত করে সে কলটা কেটে দিল।
ঘর আবার নীরব হয়ে গেল।
কিন্তু দশ সেকেন্ডও পার হলো না—
ফোনটা আবার বেজে উঠল।
একই নম্বর।
মেহরীন এবার কলটি রিসিভ করল।
—হ্যালো?
ওপাশে কোনো উত্তর নেই।
—হ্যালো… কে বলছেন?
নীরবতা।
শুধু খুব ক্ষীণ একটা শব্দ—যেন কেউ দূরে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস ফেলছে।
মেহরীনের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন করে উঠল।
—আপনি কে?
কয়েক সেকেন্ড পর ওপাশ থেকে খুব নিচু স্বরে একজন বলল,
—আপনি এখনও তাকে বিশ্বাস করেন?
মেহরীন ভ্রু কুঁচকে গেল।
—কাকে?
ওপাশের মানুষটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—যাকে আপনি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেন।
মেহরীনের চোখের ঘুম মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল।
—আপনি কী বলতে চাইছেন?
কোনো উত্তর নেই।
—দেখুন, রাত করে এসব বাজে কথা বলবেন না। আপনি কে?
কল কেটে গেল।
মেহরীন কিছুক্ষণ ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজেকেই বোঝাল—হয়তো কেউ মজা করেছে।
কিন্তু ঠিক তখনই একটা মেসেজ এল।
“তুমি যাকে বিশ্বাস করছ, সে তোমার জীবনে প্রথমবার আসেনি।”
মেহরীনের আঙুল থেমে গেল।
‘তুমি’—এই সম্বোধনটা যেন আরও অস্বস্তিকর।
সে দ্রুত নম্বরটায় কল করল।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
নম্বরটি বন্ধ।
মেহরীন বিছানায় উঠে বসল।
মাথার ভেতর একের পর এক প্রশ্ন ঘুরতে লাগল।
কাকে বোঝাচ্ছে?
আর কেন বলল—প্রথমবার আসেনি?
তার জীবনে এমন কে আছে, যে আগে একবার এসেছিল, আবার ফিরে এসেছে?
হঠাৎ একটা নাম মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
নাভিদ।
পাঁচ বছর।
পুরো পাঁচ বছর ধরে সে মানুষটার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখেনি।
নিজেকে শক্ত করে মেহরীন ফিসফিস করে বলল,
—না… অসম্ভব।
নাভিদ।
একটা নাম, অথচ নামটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মেহরীনের জীবনের এমন এক অধ্যায়, যেটা সে বহু বছর ধরে মাটিচাপা দিয়ে রেখেছে।
কেউ জানে না সেই অধ্যায়ের কথা।
অন্তত মেহরীন তাই ভেবেছিল।
ফোনটা পাশে রেখে সে আবার শুয়ে পড়ল।
কিন্তু ঘুম আর এল না।
ভোরের দিকে কখন যেন চোখ লেগে গিয়েছিল।
সকাল আটটায় ঘুম ভাঙতেই মেহরীন প্রথমে ফোনটা হাতে নিল।
রাতের নম্বরটি এখনও কল লিস্টে আছে।
মেসেজটাও আছে।
কিন্তু তার নিচে আরেকটি নতুন মেসেজ।
মেহরীনের বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
“নাভিদকে ভুলে যাও।”
কয়েক মুহূর্ত সে নিঃশব্দে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে উঠে জানালার কাছে গেল।
পর্দা সরাতেই নিচের রাস্তায় একজন মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল।
কালো শার্ট।
মাথা নিচু।
মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।
লোকটা যেন কারও অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।
মেহরীনের বুকের ভেতর অকারণ একটা ভয় জমে উঠল।
সে পর্দাটা একটু সরিয়ে আরও ভালো করে তাকাল।
ঠিক তখনই লোকটা মাথা তুলে সরাসরি মেহরীনের জানালার দিকে তাকাল।
মেহরীনের শরীর কেঁপে উঠল।
সে এক ঝটকায় পর্দা টেনে দিল।
কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর নিজেকে বোঝাল—
হয়তো কাকতালীয়।
কিন্তু কৌতূহল ভয়কে হারিয়ে দিল।
কয়েক মিনিট পর আবার পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাল সে।
লোকটা নেই।
রাস্তা প্রায় ফাঁকা।
কিন্তু রাস্তার পাশে একটা জিনিস পড়ে আছে।
সাদা রঙের একটি খাম।
মেহরীনের বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
সে দ্রুত নিচে নেমে গেল।
দরজা খুলে বাইরে এসে কয়েক পা এগিয়ে খামটার কাছে দাঁড়াল।
চারপাশে তাকাল।
কেউ নেই।
খামটা তুলে নিল সে।
খামের ওপর কোনো নাম লেখা নেই।
শুধু কালো কালিতে একটি বাক্য—
“যে সত্য তুমি ভুলে যেতে চেয়েছিলে, সেটাই তোমাকে খুঁজছে।”
মেহরীনের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে খামটা খুলল।
ভেতরে একটি পুরোনো চিঠি।
কাগজটা হলদেটে হয়ে গেছে।
চিঠির ভাঁজগুলোও পুরোনো।
মেহরীন প্রথম লাইনটা পড়েই থমকে গেল।
“মেহরীন, যদি কোনোদিন এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছায়, তাহলে বুঝবে—আমি আর তোমার কাছ থেকে দূরে নেই।”
তার বুকের ভেতর যেন কেউ প্রচণ্ড জোরে আঘাত করল।
চিঠির নিচে একটা নাম।
নাভিদ।
মেহরীন চিঠিটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখের সামনে পাঁচ বছর আগের সেই রাতটা ঝলকে উঠল।
একটা গাড়ি।
বৃষ্টিভেজা রাস্তা।
নাভিদের শেষ ফোনকল।
আর তারপর—
অন্ধকার।
মেহরীন কখনো কাউকে বলেনি, সেই রাতের পর ঠিক কী হয়েছিল।
কারণ সে নিজেও জানত না।
কিন্তু আজ তার হাতে যে চিঠি—
তারিখ দেখে মেহরীনের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল।
তারিখটা ছিল নাভিদের নিখোঁজ হওয়ার দুই বছর পরের।
মেহরীন কাঁপা হাতে চিঠিটা আবার পড়ল।
শেষ লাইনে লেখা—
“তুমি যাকে মৃত ভেবেছ, সে মৃত নয়। কিন্তু তাকে খুঁজতে যেও না। কারণ সে তোমাকে খুঁজছে না—সে তোমার কাছ থেকে পালাচ্ছে।”
মেহরীনের হাত থেকে চিঠিটা মাটিতে পড়ে গেল।
সে কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর খুব ধীরে পেছনে তাকাল।
রাস্তার ওপাশে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
কালো শার্ট।
একই মুখ।
একই চোখ।
মেহরীনের বুকের ভেতরটা থেমে গেল।
মানুষটা দূর থেকে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
তারপর ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটল।
মেহরীন এক পা পিছিয়ে গেল।
কারণ সে মানুষটাকে চিনতে পেরেছে।
সে নাভিদ।
কিন্তু—
পাঁচ বছর আগে নাভিদকে শেষবার দেখার পর মেহরীন নিজ চোখে দেখেছিল…
তার কবর।
চলবে…
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন