✓ইসলামী শরীয়তে হেবানামা ও ওসিয়তনামা
✓সন্তানের অধিকার বঞ্চিত করার বিধান ও গুনা
ভূমিকা
ইসলাম মানুষের জীবনকে শুধু ইবাদতের মাধ্যমে পরিচালিত করেনি; বরং পারিবারিক সম্পর্ক, সম্পদ, উত্তরাধিকার, হেবা ও ওসিয়তের ক্ষেত্রেও সুস্পষ্ট বিধান দিয়েছে। বিশেষ করে মৃত্যুর পর সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে ইসলাম এমন একটি ন্যায়সংগত ব্যবস্থা নির্ধারণ করেছে, যাতে কোনো উত্তরাধিকারী তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।
কিন্তু আমাদের সমাজে অনেক সময় দেখা যায়—কোনো পিতা-মাতা জীবদ্দশায় এক সন্তানকে অধিক সম্পদ দিয়ে দেন, অন্য সন্তানদের বঞ্চিত করেন; আবার কেউ মৃত্যুর আগে এমন ওসিয়ত করে যান, যার মাধ্যমে কোনো কোনো সন্তানকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। কখনো আবার হেবানামা বা ওসিয়তনামার আড়ালে ইসলামের নির্ধারিত মিরাসের বিধান পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়।
এ বিষয়ে শরিয়তের বিধান জানা অত্যন্ত জরুরি। কারণ সম্পদ মানুষের নিজের হলেও মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের অংশ আল্লাহ তাআলা নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং মানুষের ইচ্ছামতো সেই অংশ বাতিল বা পরিবর্তন করা যায় না।
✓হেবা বা হেবানামা কী?
হেবা (الهبة) অর্থ হলো—কোনো বিনিময় ছাড়াই জীবিত অবস্থায় নিজের মালিকানাধীন কোনো সম্পদ অন্য ব্যক্তিকে মালিক বানিয়ে দেওয়া।
যেমন—একজন পিতা জীবিত অবস্থায় তার নিজের জমির একটি অংশ তার ছেলেকে দান করে দিলেন এবং শরিয়তসম্মতভাবে সেই সম্পত্তির দখল/কবজাও ছেলেকে দিয়ে দিলেন। এটি হেবা।
হেবানামা হলো সেই হেবা প্রদানের লিখিত দলিল।
✓হেবা ও মিরাসের মধ্যে পার্থক্য
হেবা করা হয় জীবদ্দশায় এবং তা শরিয়তসম্মতভাবে সম্পন্ন হলে সম্পত্তি গ্রহীতার মালিকানায় চলে যায়। পক্ষান্তরে, মিরাসের অধিকার সৃষ্টি হয় মৃত্যুর পর।
অতএব, কোনো ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় তার সম্পত্তির বৈধ মালিক থাকলে, শরিয়তের নির্ধারিত শর্ত মেনে হেবা করতে পারেন। কিন্তু হেবা করার নাম করে যদি প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের অধিকার নষ্ট করার ষড়যন্ত্র করা হয়, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর হয়ে যায়।
—
✓হেবার মৌলিক বিধান
হেবা সহিহ হওয়ার জন্য সাধারণভাবে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—
১. হেবা প্রদানকারী সম্পত্তির বৈধ মালিক হতে হবে।
২. তিনি স্বেচ্ছায় সম্পত্তি দান করবেন; জবরদস্তি বা প্রতারণার মাধ্যমে হওয়া চলবে না।
৩. গ্রহীতার পক্ষ থেকে গ্রহণ থাকতে হবে।
৪. হেবা সম্পন্ন হওয়ার জন্য কবজা বা দখল হস্তান্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫. শুধু কাগজে লিখে রাখলেই প্রত্যেক ক্ষেত্রে হেবা সম্পূর্ণ হয়ে যায়—এমন নয়; বাস্তবে শরিয়তসম্মত মালিকানা ও দখল হস্তান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
৬. মৃত্যুর আশঙ্কাজনক মরণব্যাধির অবস্থায় করা দান/হেবা অনেক ক্ষেত্রে ওসিয়তের বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে যায়; তাই এ অবস্থায় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
✓সন্তানদের মধ্যে হেবা করার ক্ষেত্রে ইসলামের শিক্ষা
পিতা-মাতার সম্পদে জীবদ্দশায় সন্তানদের হেবা করার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। রাসুলুল্লাহ ﷺ সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছেন।
✓বর্ণনাকারী: আমির (রহঃ)
আমি নুমান ইবন বশীর (রাঃ)-কে মিম্বরের উপর বলতে শুনেছি যে, আমার পিতা আমাকে কিছু দান করেছিলেন। তখন (আমার মা) আমরা বিনত রাওহা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে সাক্ষী রাখা ব্যতীত সম্মত নই। তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আসলেন এবং বললেন, আমরা বিনতে রাওহার গর্ভজাত আমার পুত্রকে কিছু দান করেছি। হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে সাক্ষী রাখার জন্য সে আমাকে বলেছে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সব ছেলেকেই কি এ রকম করেছ? তিনি বললেন, না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তবে আল্লাহকে ভয় কর এবং আপনার সন্তানদের মাঝে সমতা রক্ষা কর। নুমান (রাঃ) বলেন, অতঃপর তিনি ফিরে গেলেন এবং তার দান ফিরিয়ে নিলেন।
✓সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২৫৮৭
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট যে, সন্তানদের মধ্যে অন্যায় বৈষম্য সৃষ্টি করা ইসলামের পছন্দনীয় আচরণ নয়। বিশেষ করে একজনকে সম্পদ দিয়ে অন্যদের অধিকার নষ্ট করা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
✓তবে কি সন্তানদের প্রত্যেককে হুবহু সমান হেবা করতেই হবে?
এ বিষয়ে ফকিহদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। তাই একে খুব সরলভাবে “যে কোনো অসম হেবা অবশ্যই বাতিল”—এভাবে বলা ঠিক নয়। সন্তানের প্রয়োজন, চিকিৎসা, শিক্ষা, অসচ্ছলতা, প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি বাস্তব কারণ থাকলে আলেমদের ফিকহি আলোচনায় তার পৃথক বিবেচনা রয়েছে।
✓তবে কোনো সন্তানকে ভালোবেসে অন্যদের প্রতি জুলুম করা অথবা ভবিষ্যৎ মিরাস থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে সম্পদ সরিয়ে দেওয়া শরিয়তের ন্যায়নীতির পরিপন্থী এবং গুনাহের কারণ হতে পারে।
✓ওসিয়ত বা ওসিয়তনামা কী?
ওসিয়ত (الوصية) হলো—কোনো ব্যক্তি মৃত্যুর পর তার সম্পদের একটি অংশ নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কল্যাণমূলক কাজে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে যাওয়া।
উদাহরণস্বরূপ, একজন ব্যক্তি বলেন—
“আমার মৃত্যুর পর আমার সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ এতিমদের কল্যাণে ব্যয় করা হবে।”
এটি ওসিয়ত।
✓ওসিয়ত মৃত্যুর পর কার্যকর হয়; হেবা সাধারণত জীবদ্দশায় কার্যকর হয়।
✓ওসিয়তের সর্বোচ্চ সীমা—এক-তৃতীয়াংশ
বর্ণনাকারী: সা’দ ইব্নু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ)
একবার আমি মক্কায় এমন অসুস্থ হয়ে পড়লাম যে মরণের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হলাম। নবী (ﷺ) আমার সেবা শুশ্রূষা করার জন্য আমার কাছে আসলেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমার অনেক ধন-সম্পদ আছে। আর আমার এক মেয়ে ব্যতীত আর কোন উত্তরাধিকারী নেই। আমি কি আমার মালের দুই-তৃতীয়াংশ দান করে দেব? তিনি বললেন, না। আমি বললাম, তাহলে কি অর্ধেক দান করব? তিনি বললেন, না। আমি বললাম, এক-তৃতীয়াংশ কি দান করব? তিনি বললেন: এক-তৃতীয়াংশ তো অনেক। তুমি তোমার সন্তানকে সচ্ছল অবস্থায় রেখে যাবে সেটাই উত্তম তাকে এমন অভাবগ্রস্ত রেখে যাওয়ার চেয়ে যে অবস্থায় সে মানুষের কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করবে। তুমি (পরিবার-পরিজনের জন্য) যা খরচ করবে তার বিনিময় তোমাকে দেয়া হবে। এমন কি যে লোকমাটি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দাও তারও বিনিময় দেয়া হবে।আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি কি আমার হিজ
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন