“পাঁচ বছর আগে যে রাতে নাভিদ মারা গিয়েছিল বলে সবাই জানত, সেই রাতেই হাসপাতালে ভর্তি ছিল মেহরীন।
কিন্তু হাসপাতালের নথি বলছে—সেদিন মেহরীন একা ছিল না; তার সঙ্গে ছিল এমন একজন, যার অস্তিত্বই কোনোদিন স্বীকার করা হয়নি।”
পর্ব ৭
মেহরীন ফোনটা শক্ত করে ধরে বসে রইল।
ছবিটা বারবার বড় করে দেখল।
হাসপাতালের পুরোনো নথি।
রোগীর নাম—
মেহরীন।
তারিখটা সেই রাতের।
যে রাতকে সে মনে করত নাভিদের জীবনের শেষ রাত।
কিন্তু তার নিজের স্মৃতিতে সেই রাতের কোনো হাসপাতাল নেই।
কিছুই নেই।
শুধু বৃষ্টি।
একটা গাড়ি।
নাভিদের কণ্ঠ।
তারপর অন্ধকার।
মেহরীন নিজের কপালে হাত রাখল।
হঠাৎ মাথার ভেতর একটা তীব্র ব্যথা শুরু হলো।
একটা দৃশ্য ভেসে উঠল—
সাদা আলো।
হাসপাতালের করিডোর।
কেউ একজন বলছে,
—ওকে এখন কিছু মনে করতে দেওয়া যাবে না।
আরেকজন বলছে,
—কিন্তু যদি মনে পড়ে যায়?
প্রথম কণ্ঠটা ঠান্ডা হয়ে বলল,
—তাহলে নাভিদের সবকিছু শেষ হয়ে যাবে।
মেহরীন চোখ খুলে উঠে বসল।
তার বুক ধড়ফড় করছে।
এটা কি স্মৃতি?
নাকি কল্পনা?
সে নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করল, হয়তো অতিরিক্ত ভয় থেকেই এসব মনে হচ্ছে।
ঠিক তখন ফোনে আরেকটা মেসেজ এলো।
“তুমি এখন যা মনে করার চেষ্টা করছ, তার কিছুই তোমার নিজের স্মৃতি নয়।”
মেহরীনের হাত কেঁপে উঠল।
সে সঙ্গে সঙ্গে লিখল—
“তাহলে আমার স্মৃতি কে বদলেছে?”
কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এলো।
“যে মানুষটা তোমার সবচেয়ে কাছের ছিল।”
মেহরীন স্থির হয়ে গেল।
তার মনে প্রথমেই একজনের কথা এল।
মায়া।
কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেই মাথা নাড়ল।
না।
মায়া যদি সত্যিই তার বোন হয়, তাহলে এত বছর তাকে লুকিয়ে রাখার কারণ কী?
আর মায়া যদি সব জানে—
তাহলে এতদিন চুপ ছিল কেন?
মেহরীন দ্রুত মায়াকে ফোন করল।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
ফোন বন্ধ।
সে আবার চেষ্টা করল।
একই ফল।
হঠাৎ দরজার বাইরে পায়ের শব্দ হলো।
মেহরীন চুপ করে গেল।
পায়ের শব্দটা ধীরে ধীরে তার ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে।
একবার থামল।
তারপর—
ঠক।
দরজায় একটা আঘাত।
মেহরীন নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।
আরেকবার—
ঠক।
সে খুব আস্তে বলল,
—কে?
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর নেই।
মেহরীন দরজার কাছে গিয়ে কান পাতল।
কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
সে বুঝতে পারছে।
কিন্তু কে?
হঠাৎ ফোনটা আবার বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
মেহরীন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
ঠিক তখন দরজার ওপাশ থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—
—দরজা খুলো না।
মেহরীনের বুক কেঁপে উঠল।
কারণ কণ্ঠটা নাভিদের।
সে পিছিয়ে গেল।
—নাভিদ?
ওপাশ থেকে খুব নিচু স্বরে উত্তর এলো—
—আমি বাইরে নেই।
মেহরীনের শরীর অবশ হয়ে গেল।
—তাহলে কে?
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর—
—যে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, সে আমার মুখ পরে আছে।
মেহরীনের চোখ দরজার দিকে আটকে গেল।
তারপর দরজার হাতল ধীরে ধীরে নড়ল।
একবার।
দুবার।
তারপর থেমে গেল।
মেহরীন নিঃশব্দে পিছিয়ে গেল।
ফোনের ওপাশ থেকে নাভিদ বলল,
—জানালাটা খুলো।
—কেন?
—এখনই।
মেহরীন জানালার দিকে তাকাল।
তৃতীয় তলায় তার ঘর।
নিচে অন্ধকার।
—আমি কীভাবে বের হব?
—বের হতে হবে না। শুধু জানালাটা খুলো।
মেহরীন কাঁপা হাতে জানালাটা খুলল।
বাইরে তাকাতেই তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।
জানালার ঠিক নিচে ছাদের কার্নিশে একটা ছোট্ট লোহার বাক্স রাখা।
এত ওপরে সেটা কে রাখল?
মেহরীন হাত বাড়িয়ে কোনোভাবে বাক্সটা টেনে নিল।
বাক্সের ওপর লেখা—
“১৭-এর পরের সংখ্যা মনে আছে?”
মেহরীনের বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
১৭।
সেই চাবি।
রেলস্টেশনের লকার।
তারপর?
সে বাক্সটা খুলল।
ভেতরে একটা পুরোনো ক্যাসেট।
আর একটা ছোট কাগজ।
কাগজে লেখা—
“এটা শোনার আগে মায়াকে খুঁজে বের করো।”
মেহরীন থমকে গেল।
—নাভিদ, এটা কী?
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর নেই।
—নাভিদ?
নীরবতা।
কল কেটে গেছে।
মেহরীন আবার কল করল।
নম্বর বন্ধ।
ঠিক তখন দরজায় আবার শব্দ হলো।
এবার আগের চেয়ে জোরে।
ধাম!
মেহরীন চমকে উঠল।
—মেহরীন!
দরজার ওপাশ থেকে মায়ার কণ্ঠ।
মেহরীনের বুকটা হালকা হয়ে গেল।
—মায়া!
সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
হাতল ধরল।
কিন্তু ঠিক খুলতে যাবে—
তার চোখ পড়ল মেঝের দিকে।
দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে বাইরে থেকে আলো আসছে।
আর সেই আলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে—
দুটি পা।
মায়ার।
কিন্তু মেহরীন ঠিক তখনই বুঝতে পারল—
মায়া সাধারণত যে সাদা জুতো পরে, সেটা আজ বাইরে থাকা পায়ের সঙ্গে নেই।
বরং পায়ে কালো বুট।
মেহরীনের বুকের ভেতরটা বরফ হয়ে গেল।
দরজার ওপাশ থেকে মায়ার কণ্ঠ আবার এল—
—দরজা খোলো। আমি একা এসেছি।
মেহরীন কোনো উত্তর দিল না।
কয়েক সেকেন্ড পর কণ্ঠটা বদলে গেল।
আর এবার যে কণ্ঠ শুনল—
সেটা মেহরীনের নিজের কণ্ঠ।
—দরজা খোলো, মেহরীন। আমি তো তুমি।
মেহরীন পিছিয়ে গেল।
তার চোখ আটকে গেল আয়নার দিকে।
আয়নার ভেতর সে নিজেকেই দেখছে।
কিন্তু তার প্রতিবিম্ব—
হাসছে।
মেহরীন হাসছে না।
প্রতিবিম্বটা ধীরে ধীরে ঠোঁট নাড়ল।
কোনো শব্দ বের হলো না।
তবু মেহরীন স্পষ্ট বুঝতে পারল—
সে বলছে,
“মায়াকে বিশ্বাস কোরো না।”
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের আলো নিভে গেল।
অন্ধকারে শুধু একটা শব্দ শোনা গেল—
ক্যাসেট প্লেয়ারের ক্লিক।
কেউ একজন ক্যাসেটটা চালু করেছে।
তারপর অন্ধকার ঘরের মধ্যে পাঁচ বছর আগের একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—
—মেহরীন, যদি তুমি এই রেকর্ডিং শুনতে পাও, তাহলে বুঝবে… তোমার বাবা তোমাকে যা বলেছিল, তার কিছুই সত্যি ছিল না।
মেহরীনের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।
রেকর্ডিংয়ের কণ্ঠটা থেমে গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য।
তারপর শেষ কথাটা শোনা গেল—
—কারণ তোমার বাবা জানতেন, সেই রাতে গাড়িটা কে চালাচ্ছিল।
ক্যাসেট থেমে গেল।
আর দরজার ওপাশ থেকে ধীরে ধীরে ভেসে এলো—
—মেহরীন… দরজা খোলো। তোমার বাবার কথা আমি তোমাকে বলব।
চলবে…
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন