“একই মুখ—একই চোখ—তবু তারা দুজন দুই মানুষ।
কিন্তু মেহরীনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি যখন তার শৈশবের এমন একটি গোপন কথা বলে দিল, যা পৃথিবীতে আর কেউ জানত না—তখন ভয়টা আর সন্দেহ রইল না।”
পর্ব ৪
মেহরীন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।
মেয়েটা ধীরে ধীরে আরও কাছে এগিয়ে এলো।
আলোটা তার মুখের ওপর পড়তেই মেহরীন নিজের মুখটাই যেন নিজের সামনে দেখতে পেল।
একই চোখ।
একই ঠোঁট।
একই ভ্রুর বাঁক।
শুধু চোখের ভেতরে একটা অদ্ভুত শূন্যতা।
মেহরীন ফিসফিস করে বলল,
—তুমি কে?
মেয়েটা কোনো উত্তর দিল না।
বরং খুব শান্তভাবে বলল,
—ছোটবেলায় তুমি বৃষ্টির দিনে ছাদে উঠতে ভয় পেতে।
মেহরীনের বুক কেঁপে উঠল।
মেয়েটা আবার বলল,
—তবু একদিন তুমি একা ছাদে উঠেছিলে। সেদিন তোমার নীল ফ্রকটা ভিজে গিয়েছিল। মা তোমাকে অনেক বকেছিল।
মেহরীনের চোখ বড় হয়ে গেল।
এই ঘটনা কেউ জানে না।
এমনকি তার মায়েরও এখন আর মনে থাকার কথা নয়।
মেয়েটা ধীরে ধীরে বলল,
—তুমি সেদিন কাঁদতে কাঁদতে আমাকে বলেছিলে, “তুই থাকলে আমি কখনো ভয় পাব না।”
মেহরীনের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
—তুমি… আমার বোন?
মেয়েটার চোখে এবার পানি জমল।
—এত বছর পরেও আমাকে চিনতে পারলে না?
মেহরীন এক পা এগিয়ে গেল।
—তোমার নাম?
মেয়েটা ঠোঁট নড়াল।
—মায়া।
নামটা শুনেই মেহরীনের মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হলো।
মায়া।
একটা নাম।
যেটা সে বহু বছর ধরে নিজের স্মৃতি থেকে মুছে ফেলেছে।
তার ছোটবেলার একটা ছবি ছিল।
দুইটি মেয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
একজন মেহরীন।
আরেকজন—
মায়া।
কিন্তু সেই ছবিটা কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল, সে জানত না।
মেহরীন কাঁপা গলায় বলল,
—তাহলে সবাই বলেছিল তুমি মারা গেছ।
মায়া মৃদু হাসল।
—সবাই নয়।
—কে বলেছিল?
মায়া উত্তর দেওয়ার আগেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা বলল,
—এখন এসব জানার সময় নেই।
মেহরীন তার দিকে তাকাল।
—আপনি আসলে কে?
লোকটা এবার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর মুখের ওপর থাকা কালো মাস্কটা খুলে ফেলল।
মেহরীনের চোখ বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল।
এই মুখটাও পরিচিত।
কিন্তু কোথা থেকে?
হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল—
পাঁচ বছর আগের সেই রাত।
দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে যে লোকটা প্রথম তাকে বলেছিল,
“নাভিদ আর নেই।”
এই মানুষটাই ছিল সে।
মেহরীনের শরীর কেঁপে উঠল।
—আপনি!
লোকটা চোখ নামিয়ে বলল,
—হ্যাঁ।
—আপনি আমাকে মিথ্যা বলেছিলেন!
—আমাকে বাধ্য করা হয়েছিল।
—কে বাধ্য করেছিল?
লোকটা এবার মায়ার দিকে তাকাল।
মায়া মাথা নিচু করল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
—যে মানুষটা আমাদের দুজনকেই জন্মের পর থেকেই আলাদা করে রেখেছিল।
মেহরীন থমকে গেল।
—কে?
মায়া উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে গুলির শব্দ হলো।
ঠাস!
সবাই চমকে উঠল।
দ্বিতীয় গুলির শব্দ আরও কাছে।
ঠাস!
লোকটা দ্রুত মেহরীনকে নিচু করে দিল।
—নিচু হও!
স্টেশনের জানালার কাঁচ ভেঙে মেঝেতে ছিটকে পড়ল।
মায়া চিৎকার করে উঠল।
—ওরা আমাদের খুঁজে পেয়েছে!
লোকটা মেহরীনের হাত ধরে টেনে বলল,
—এই পথ দিয়ে বের হতে হবে।
—কোথায়?
—নাভিদের কাছে।
মেহরীনের বুক ধক করে উঠল।
—নাভিদ বেঁচে আছে?
লোকটা কোনো উত্তর দিল না।
শুধু বলল,
—বেঁচে আছে বলেই তো তোমাকে এতদিন সত্যিটা থেকে দূরে রাখা হয়েছে।
তারা স্টেশনের পেছনের সরু করিডোর দিয়ে দৌড়াতে লাগল।
মেহরীনের হাতে তখনও দ্বিতীয় চিঠিটা।
দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ সে চিঠিটার শেষ অংশ দেখতে পেল।
আগে অন্ধকারে খেয়াল করেনি।
শেষ লাইনের নিচে ছোট করে আরও কিছু লেখা।
সে থেমে গেল।
মায়া তার হাত ধরে টানল।
—থামলে চলবে না!
কিন্তু মেহরীনের চোখ আটকে গেছে সেই লেখায়।
মাত্র পাঁচটি শব্দ—
“নাভিদকে বিশ্বাস কোরো না।”
মেহরীনের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
—মায়া…
—কী?
মেহরীন চিঠিটা তার সামনে ধরল।
—এটা কে লিখেছে?
মায়ার মুখের রং মুহূর্তেই বদলে গেল।
কয়েক সেকেন্ড সে চুপ করে রইল।
তারপর ফিসফিস করে বলল—
—নাভিদ।
মেহরীনের হাত কেঁপে উঠল।
—কিন্তু কেন?
মায়া এবার তার চোখের দিকে তাকাল।
তারপর এমন একটা কথা বলল, যার জন্য মেহরীন প্রস্তুত ছিল না—
“কারণ পাঁচ বছর আগে যে মানুষটাকে তুমি নাভিদ ভেবে কবর দিয়েছিলে… সেটা নাভিদ ছিল না। কিন্তু যে নাভিদ আজ তোমাকে খুঁজছে—সে-ও আগের নাভিদ নয়।”
ঠিক তখনই তাদের পেছনে পায়ের শব্দ থেমে গেল।
কেউ একজন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বলল—
—মায়া… মেহরীনকে আর এক ধাপও এগোতে দিও না।
মেহরীন ধীরে ধীরে পিছনে তাকাল।
অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে তার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
কারণ সেই মানুষটি—
নাভিদ।
আর তার হাতে ছিল একটি বন্দুক।
চলবে…
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন