কিন্তু আজ যে মানুষটা তার সামনে দাঁড়িয়ে, তাকে পাঁচ বছর আগে নিজের চোখে কবর দিতে দেখেছিল সে।”
পর্ব ২
মেহরীন নড়তে পারছিল না।
রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার চোখ দুটো যেন সরাসরি তার বুকের ভেতর তাকিয়ে আছে।
একই মুখ।
একই চোখ।
নাভিদ।
অসম্ভব।
মেহরীন নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করল।
এক…
দুই…
তিন…
আবার চোখ খুলল।
মানুষটা এখনও সেখানে।
এবার সে এক পা এগিয়ে এল।
মেহরীনের বুকের ভেতর থেকে একটা চাপা চিৎকার বেরিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।
পাঁচ বছর আগে যার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে সে শেষবার কেঁদেছিল, আজ সেই মানুষটিই তার সামনে দাঁড়িয়ে।
কীভাবে?
কেন?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
তাহলে পাঁচ বছর আগে যে মানুষটাকে কবর দেওয়া হয়েছিল, সে কে ছিল?
মেহরীন পিছিয়ে যেতে যেতে দরজার কাছে এসে ঠেকে গেল।
নাভিদ রাস্তা পার হলো না।
শুধু দূর থেকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব ধীরে ডান হাতটা উঠিয়ে একটা ইশারা করল।
মেহরীন বুঝতে পারল না ইশারাটার অর্থ কী।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
তার চোখ রাস্তার ওপাশেই আটকে রইল।
ফোনটা দ্বিতীয়বার বাজল।
তারপর তৃতীয়বার।
মেহরীন কাঁপা হাতে কলটা ধরল।
—হ্যালো?
ওপাশে সেই কণ্ঠ।
শীতল।
নিচু।
পরিচিত।
—চিঠিটা পেয়েছ?
মেহরীনের ঠোঁট শুকিয়ে গেল।
সে কোনো উত্তর দিল না।
কণ্ঠটা আবার বলল,
—আমি বলেছিলাম, নাভিদকে ভুলে যেতে।
মেহরীন এবার সাহস করে বলল,
—তুমি কে?
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর উত্তর এলো,
—যে তোমাকে পাঁচ বছর ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে।
মেহরীনের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
—কী বলতে চাইছ?
—সব জানতে চাও?
মেহরীন রাস্তার দিকে তাকাল।
নাভিদ এখনও দাঁড়িয়ে।
কিন্তু এবার তার মুখের সেই অদ্ভুত হাসিটা নেই।
বরং সে অস্থিরভাবে চারপাশে তাকাচ্ছে।
যেন কাউকে খুঁজছে।
ওপাশের কণ্ঠ বলল,
—তাহলে আজ রাত বারোটায় পুরোনো রেলস্টেশনে এসো।
মেহরীন চুপ করে রইল।
—একা আসবে।
কল কেটে গেল।
মেহরীন কয়েক সেকেন্ড ফোনটা কানে ধরে রেখেই দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর আবার রাস্তার দিকে তাকাল।
নাভিদ নেই।
এক মুহূর্ত আগেও যে মানুষটা সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
মেহরীন দ্রুত রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল।
কেউ নেই।
শুধু যেখানে নাভিদ দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে পড়ে আছে একটা ছোট্ট কালো বস্তু।
মেহরীন সেটা তুলে নিল।
একটা পুরোনো চাবি।
চাবিটার সঙ্গে বাঁধা ছোট্ট ধাতব ট্যাগে লেখা—
১৭
মেহরীনের বুকের ভেতরটা আবার কেঁপে উঠল।
১৭ নম্বর।
এই সংখ্যাটা সে চেনে।
অনেক বছর আগে নাভিদ তাকে একবার বলেছিল—
“যদি কখনো আমি হারিয়ে যাই, ১৭ নম্বরটা মনে রেখো।”
সেদিন মেহরীন হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল কথাটা।
আজ সেই একই সংখ্যা তার হাতে।
কিন্তু নাভিদ কেন তাকে চাবিটা দিল?
আর কীসের চাবি এটা?
সেদিন সারাটা দিন মেহরীন স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।
কিন্তু পারল না।
বারবার সেই রাতটার কথা মনে পড়ছিল।
পাঁচ বছর আগের বৃষ্টিভেজা রাত।
নাভিদের ফোন।
তারপর দুর্ঘটনার খবর।
হাসপাতালের করিডোর।
সাদা চাদরে ঢাকা একটা শরীর।
আর তারপর—
কবর।
কিন্তু মেহরীন একটা বিষয় কখনো কাউকে বলেনি।
সে নাভিদের মুখ দেখেনি।
সেদিন হাসপাতালের লোকেরা বলেছিল, মুখের অবস্থা এমন ছিল যে শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
পরিবারের একজন কাছের মানুষই পরিচয় নিশ্চিত করেছিল।
মেহরীন শুধু দূর থেকে সাদা চাদরের নিচে থাকা শরীরটা দেখেছিল।
তাহলে…
সে কি এতদিন ভুল মানুষকে নাভিদ ভেবে শোক করেছে?
নাকি কেউ ইচ্ছা করেই তাকে বিশ্বাস করিয়েছে যে নাভিদ মারা গেছে?
মেহরীন নিজের মাথা চেপে ধরল।
না।
এভাবে ভাবলে সে পাগল হয়ে যাবে।
রাত এগারোটা পঞ্চান্ন।
মেহরীন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে।
তার হাতে সেই পুরোনো চাবি।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল না।
তবু সে জানে—
সে যাবে।
কারণ কিছু সত্য থেকে পালিয়ে থাকা যায়।
কিন্তু কিছু সত্য নিজেই দরজায় এসে দাঁড়ায়।
বারোটার পাঁচ মিনিট আগে সে বাড়ি থেকে বের হলো।
রাস্তাগুলো প্রায় ফাঁকা।
দূরে পুরোনো রেলস্টেশনের ভাঙা সাইনবোর্ড দেখা যাচ্ছে।
মেহরীন স্টেশনের ভেতরে ঢুকল।
চারপাশ অন্ধকার।
পুরোনো প্ল্যাটফর্মে বাতাসের সঙ্গে টিনের ছাদ কাঁপছে।
সে মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে সামনে এগোতে লাগল।
তারপর দেখতে পেল—
১৭ নম্বর লকার।
মেহরীনের হাত কেঁপে উঠল।
চাবিটা তালায় ঢোকাল।
একবার ঘোরাতেই—
ক্লিক।
লকার খুলে গেল।
ভেতরে একটা ছোট্ট বাক্স।
আর বাক্সের ওপর রাখা একটি ছবি।
মেহরীন ছবিটা হাতে তুলল।
ছবিতে নাভিদ দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু তার পাশে যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে—
তাকে দেখে মেহরীনের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।
কারণ মেয়েটি দেখতে অবিকল—
মেহরীনের মতো।
ছবির পেছনে কালো কালিতে লেখা মাত্র একটি বাক্য—
“তোমার যমজ বোনের কথা তোমাকে কে বলেছিল যে সে মারা গেছে?”
মেহরীনের হাত থেকে ছবিটা পড়ে গেল।
ঠিক তখনই স্টেশনের অন্ধকার প্রান্ত থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—
—মেহরীন…
সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
অন্ধকারের মধ্যে একটা ছায়া দাঁড়িয়ে।
কণ্ঠটা আবার বলল,
—তুমি এত দেরি করে এলে কেন?
মেহরীন কাঁপা গলায় বলল,
—নাভিদ?
ছায়াটা ধীরে ধীরে আলোয় এগিয়ে এলো।
কিন্তু সেটা নাভিদ নয়।
মেহরীনের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
কারণ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি—
তার নিজের বাবা।
আর মেহরীন জানে…
তার বাবা তিন বছর আগে মারা গেছেন।
চলবে…
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন