• রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৮ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
কালীগঞ্জে ১২ বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও গর্ভপাতের অভিযোগ, আটক ৩ মাদক বিরোধী অভিযানে মাদক কারবারি আটক করে থানায় আসার সময় এস আই সহ নিহত ২ আহত ২ জন মোঃ মুক্তাদির হোসেন, বাংলাদেশ কবিতা সংসদের সাহিত্য সম্মেলন প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত কবিতা: সমাজের আয়না সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়েই আমরা এ সমাজে বসবাস করি: ফজলুল হক মিলন এমপি দুর্গাপূজার মণ্ডপে মণ্ডপে এমপি মিলন, দিলেন পাশে থাকার আশ্বাস তুমুলিয়া ইউনিয়নের ইতিহাসে প্রথম নারী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শিখা বেগম কবিতা:মায়ার পৃথিবী, সত্যের স্রষ্টা — একটি আত্মোপলব্ধির কবিতা রচনায়: মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম তারিখ:১৬/১০/২০২৬ স্বী স্ত্রীর রমীমা মাদক ব্যবসা কালীগঞ্জে ১ কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তার ১, কালীগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ীদের উদ্যেগে ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত

গল্প : ফাগুনে পবন, কলমে: হালিমা আক্তার জোনাকি, প্রথম পর্ব। দৈনিক বাংলার কথা।  

বাংলার কথা ডেস্ক / ৩৫ বার পঠিত
আপডেটঃ বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬

গল্প : ফাগুনে পবন।। 

কলমে: হালিমা আক্তার জোনাকি। 

পর্ব ০১

 

প্লিজ দোস্ত আমার সঙ্গে চল। বড় আম্মু বলেছে তোকে না নিয়ে গেলে আমাকে বিয়েবাড়িতে ঢুকতে দেবে না। কতো আদরের ছোটবোন আমার। ওর বিয়ে নিয়ে কতো প্ল্যানিং করেছি। আমি বাকি কাজিনদের সঙ্গে মিলে নাচও প্র্যাক্টিস করে ফেলেছি। আর কিছু না হোক আমার নাচ দেখতে অন্তত চল।”

 

করজোড়ে নিজ আর্জি পেশ করলো রায়হান। তাঁর এতো শত অনুনয় বিনয়ের প্রেক্ষিতেও বিপরীত দিকে থাকা মানবের চেহারায় কোনো ভাবের উদয় হলো না। দৃষ্টি অব্ধি ফেরালো না তাঁর পানে। সে আকাশ দেখতে ব্যস্ত। একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে পাহাড়ের আড়ালে ধীরে ধীরে অস্তমিত হওয়া সূর্যটার দিকে। বিদায়ের অন্তিম ক্ষণে এসে হাল্কা কমলারঙা আলোকছটা ছিটিয়ে যাচ্ছে চারপাশে। রাঙিয়ে দিচ্ছে প্রকৃতিকে।

নিজের আবেদন এভাবে খারিজ হতে দেখেও দমলো না রায়হান। সে এবারে দুই হাতে পাশে বসে থাকা পুরুষটির কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললো “কিরে আরহাম চুপ করে আছিস কেন? কিছু তো বল।”

সূর্য সম্পূর্ণরূপে পাহাড়ের তলদেশে হারিয়ে যেতেই আরহামের মনে দয়ার উদ্রেক হলো বোধহয়। সে রায়হানের দিকে তাকিয়ে গুরুগম্ভীর স্বরে বললো “তোর নাচ দেখার কোনো সখ নেই আমার। মনে নেই কলেজের নবীন বরণ উৎসবে কেমন ব্যাঙের মতো লাফিয়েছিলি? পুরো কলেজের সামনে আমাদের গ্রুপটার নাম ডুবিয়ে ছিলি তুই। তোর সঙ্গে যখনই হাঁটতাম তখনই দেখতাম কেউ না কেউ দাঁত বের করে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। বহুকষ্টে লাস্টের একটা বছর পাড় করেছি। দ্বিতীয়বার ঐ ট্রমার ভেতর দিয়ে যেতে চাই না আমি।”

 

আরহামের কথায় ব্যথিত হলো রায়হানের মন। পেল্লায় সাইজের একটা অদৃশ্য তালা ঝুলে গেলো তাঁর অধরোষ্ঠে। মুখ লটকে অসহায়ের মতো চেয়ে রইলো আরহামের দিকে। সে নাহয় অতীতে একটা ভুল করে ফেলেছে। সেটা এখন কেবলমাত্র স্মৃতি। তার জন্য এখনো এভাবে খোটা দিতে হবে? এই তাঁদের বন্ধুত্ব? ভারাক্রান্ত মনে অতীতের স্মৃতিচারণ করতে লাগলো রায়হান। মস্তিষ্ক তাঁকে ঠকালো না। ভুলে গিয়েছি বলেও যত্ন সহকারে মগজের একাংশে সবটা টুকে রেখেছে। ঠিকঠিক মনে রেখেছে কি হয়েছিল আজ থেকে কয়েক বছর আগে।

 

সে বছর সিনিয়র হিসেবে কলেজের নবীন বরণ উৎসবে নাচার কথা ছিল রায়হানের। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হচ্ছিল। বিপত্তি বাঁধলো স্টেজে উঠে। মহোদয় নাচতে গিয়ে সামনে অত মানুষ দেখে নার্ভাস হয়ে পড়লো। ফলস্রুতিতে যা হওয়ার তাই হলো। গুলিয়ে ফেললো নাচের স্টেপ। ঐদিকে দর্শক সারিতে উপস্থিত সবাই তীর্থের কাকের ন্যায় হা করে তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে। অপেক্ষা করছে নাচ দেখার। উৎসুক জনতার একাংশ তো অধৈর্য্য হয়ে রীতিমতো চিৎকার চেচামেচি শুরু করে দিয়েছে। কি করবে না করবে বুঝতে না পেরে নিয়ে ফেললো হঠকারী এক সিদ্ধান্ত। মানসম্মান রক্ষার্থে যেভাবে পারলো গানের তালে তালে হাত পা ছুড়তে লাগলো। কিসের নাচ, কিসের কি? তালে বেতালে মাথায় যা আসছিল তাই করছিল। মুহুর্তের মধ্যে হাসির রোল পড়ে গেলো পুরো অডিটোরিয়ামে। নাচ থেমে গেলো তাঁর। তাড়াহুড়োয় নেয়া সিদ্ধান্ত যে বিপদ ডেকে এনেছে হাড়ে হাড়ে টের পেলো সেটা। বুঝতে পারলো, যে মান ইজ্জত বাঁচাতে এতক্ষণ ব্যাঙের মতো লাফালাফি করছিল সেটাকেই নিজ দায়িত্বে নিলামে তুলেছে। কালবিলম্ব করলো না আর। এক লাফে স্টেজ থেকে নেমে সোজা লুকিয়ে পড়লো পর্দার আড়ালে। অডিটোরিয়ামে উপস্থিত প্রতিটি প্রাণী তখনো হাসছিল।

সেই ঘটনা মনে পড়লে আজও অন্তর আত্না কেঁপে ওঠে রায়হানের। কম ভোগান্তি পোহাতে হয়নি তাঁকে। গোটা একটা বছর লুকিয়ে লুকিয়ে থেকেছে। চোরের মতো মুখ লুকিয়ে যাতায়াত করেছে কলেজে। জুনিয়রদের কাছ থেকে প্রাপ্য সম্মানটুকু অব্ধি পায়নি। আরও কতো কি। শত চেষ্টা সাধনার পরে সেইদিনের সেই ভয়ানক স্মৃতিগুলোকে মাটি চাপা দিতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু সে ভুলতে ভুলতে এটাই ভুলে গিয়েছিল যে বন্ধু নামক একখানা শত্রু আছে তাঁর। যাঁর আবার স্মৃতিশক্তি তুখোড়। ছোট থেকে ছোট জিনিসটাও ভোলে না সেই ঘর শত্রু বিভীষণ।

 

রায়হান ভাবতে ব্যস্ত। আরহাম ব্যঙ্গাত্মক সুরে বললো “কিরে কিছু কি মনে পড়লো? মনে না পড়লে বল আমি হেল্প করছি। সবটা স্পষ্ট মনে আছে আমার। কি গানে যেন নেচেছিলি? ও হ্যা মনে পড়েছে ‘’বসন্ত বাতাসে সই গো বসন্ত বাতাসে’’

সুর টেনে বললো আরহাম। রায়হান তাঁকে থামিয়ে দিয়ে মিনমিনে গলায় বললো “থাক তোকে আর ব্রেন খরচ করতে হবে না। অনেকদিন পরে ছুটি পেয়েছিস শরীরের সঙ্গে সঙ্গে ওটাকেও একটু রেস্ট দে। আর তোকে আমার নাচও দেখতে হবে না। বড় আম্মুর অনুরোধ রাখতে অন্তত চল।”

আরহাম সরু চোখে চেয়ে জানতে চাইলো “আমি যে ছুটি কাটাচ্ছি সেটা চাচি কি করে জানলো?”

রায়হান ঝকঝকে তকতকে দন্ত প্রদর্শন করে বললো “আমি মুখ ফস্কে বলে ফেলেছি।”

“কোনদিন জানি তোর ঐ হুটহাট ফস্কে যাওয়া মুখটা আমি সেলাই করে দেই।”

“যেটা করছিস সেটা নিয়েই থাক না। তোকে আর্মির ইউনিফর্মে দেখতে হেব্বি লাগে। কি দরকার আমার মতো একজন তুচ্ছ মানুষের জন্য নিজের মহৎ প্রফেশন পাল্টে শুধু শুধু দর্জি হওয়ার। এখন চল আমার সঙ্গে।”

“সারা শরীরে আলসেমি আমার। কোথায় ভাবলাম এবারের ছুটিটা শুয়ে বসে কাটাবো। তা না তুই টেনেটুনে ঝামেলার কাছে নিয়ে যাচ্ছিস।”

রায়হান মিছেমিছি রাগ দেখিয়ে বললল “কিসের ঝামেলা? রূপসা কি আমার একার বোন? তুই না যেচেপড়ে ওর সঙ্গে ভাইবোনের সম্পর্ক পাতিয়েছিস? আদর দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলেছিস ঐ পেত্নীটাকে। এখন মজা বোঝ। পেত্নীটা সাফ সাফ বলে দিয়েছে তুই না গেলে বিয়ের আসরে বসবে না।”

আরহাম উঠে দাঁড়ালো। রায়হানের কাঁধে হাত রেখে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো “রূপসা সত্যিই এটা বলেছে?”

“তোর বিশ্বাস না হলে আমি কল দেই? কথা বলে দেখ কি বলে?”

“না থাক। চল বাড়িতে যাই।”

দুই বন্ধু কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ফুরফুরে মেজাজে নামতে লাগলো পাহাড়ের গা বেয়ে। আঁকাবাকা ঢালু রাস্তা দিয়ে হেলেদুলে চলছে দু’জন। সেই সঙ্গে টুকটাক গল্প আর খুনসুটি তো আছেই। ও কে খোঁচাচ্ছে তো ও আবার এর গায়ে কিল ঘুষি বসাচ্ছে। এই মুহুর্তে এঁদের দেখলে কেউ বলবে না দু’জনের বয়সই ত্রিশ ছুঁই ছুঁই। গল্পের এক পর্যায়ে রায়হান বলে উঠলো “দোস্ত একটা জিনিস কি তোর চোখে লাগে নাই?

“কি?”

“আমাদের ফ্রেন্ড সার্কেলের সবাই মোটামুটি বিয়েশাদি করে সেটেল হয়ে গেছে। বাচ্চাকাচ্চা পয়দা করে চুটিয়ে সংসারও করছে। ইভেন আমরা যাদেরকে হইতে দেখছি তাঁরাও বিয়ে আর নয়তো প্রেম করছে। যেগুলারে দেখতাম বিলাই প্যান্ট পরে গায়ে কেজি খানেক পাউডার মেখে আমাদের সামনে হাঁটাহাঁটি করতো তাঁদের বাচ্চাগুলোও ডায়াপার পরে আঙ্কেল আঙ্কেল বলে ডাকে, কোলে ওঠার বায়না ধরে। শুধু তুই আর আমিই বাকি রয়ে গেছি।”

“হুম তো?”

“কিসের হুম তো? বিয়েথা কবে করছিস তুই? আদৌও করছিস তো?”

“জানি না। আমি অপেক্ষায় আছি।”

“কার অপেক্ষায়?”

“আমার হৃদয়হরণীর।

রায়হান চকিত নজরে আরহামের দিকে তাকিয়ে বললো “হৃদরহরণী?”

“হ্যা, হৃদয়হরণী। যাকে দেখলে আমার একটা হার্টবিট মিস হয়ে যাবে। মন মস্তিষ্ক একসঙ্গে চেঁচিয়ে জানান দেবে ‘শি ইজ দা ওয়ান ফর মি’। যাকে দেখলে যেকোনো মূল্যে আপন করে পাওয়ার জেদ চেপে বসবে মাথায়।”

রায়হান আরহামের কাঁধ চাপড়ে বললো “বাব্বা, ক্যাপ্টেন আরহাম তালুকদার দেখছি পুরাই ফিল্মি স্টাইলে প্রেমে পড়তে চাইছে। কিন্তু দোস্ত বাস্তবে এমনটা হবে কি?”

“না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবুও আমি অপেক্ষায় আছি। এমন একটা মুহুর্ত এলে মন্দ হয়না বুঝলি। জীবনে রুলস, রেস্ট্রিকশনস একটু বেশি হয়ে গেছে। যুক্তি দিয়ে সবকিছু দেখতে দেখতে জীবনটা বড্ড একঘেয়ে ঠেকছে। বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে ফিল্মি ঢঙে কেউ এলে ভালোই হবে। একটুআধটু পরিবর্তন আর একঝাঁক পাগলামি নিয়ে কেউ একজন আসবে। আমি তাঁর সব পাগলামি শুদ্ধ তাঁকে সামলাবো আর সে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত আমিটাকে সামলাবে। কি বলিস?

রায়হান তালি বাজিয়ে বললো “বাহ কি দারুণ কথা বললি। এনি ওয়ে, অল দা বেস্ট ফর ইউর ফিল্মি লাভ স্টোরি।”

বলেই ফিক করে হেঁসে দিলো। আরহামও হাসলো। তবে সেটা মুচকি হাসি। দাঁত কেলিয়ে হাসার অভ্যাস তাঁর কোনোকালেই ছিল না। আর তাঁর হাসির কারণও ভিন্ন। রায়হানের বোকামি দেখে হাসছে সে। সে কি সব ভুজুংভাজুং দিলো আর রায়হানও বিনা বাক্যব্যয়ে সবটা বিশ্বাস করে নিলো! বন্ধুর এমন বুদ্ধি স্বল্পতা দেখে অভ্যেসের বাইরে গিয়ে সশব্দে হাসবে নাকি আফসোস করবে সেটাই বুঝতে পারছে না।

পাহাড় থেকে নেমে রাস্তায় এসে পৌঁছাল দু’জন। একটা সিএনজি ঠিক করে দু’জনেই চড়ে বসলো সেটাতে। সিএনজি ছুটলো নির্ধারিত গন্তব্যে।

 

বিয়েবাড়ির আমেজ। চারিদিকে হইহট্টগোল। যে যাঁর মতো করে ব্যস্ত। দম ফেলার ফুরসত নেই কারোরই। সবার কাঁধেই কিছু না কিছু দায়িত্ব তুলে দেয়া হয়েছে। বাড়ির সবচেয়ে অলস ব্যক্তিটিও দুদণ্ড বসার অবকাশ পাচ্ছে না। সে বসতে চাইলেই কেউ না কেউ তেড়ে আসছে তাঁর দিকে। কাল বাদে পরশু বিয়ে। বিয়ের বহু আয়োজন এখনো বাকি। আজ আবার মেহেদী সন্ধ্যা। এসব নিয়ে বাড়ির বড়রা যেমন গুরুদায়িত্ব পালন করছে ছোটরাও তেমন নিজেদের মতো করে বিয়েবাড়ি মাতাতে ব্যস্ত। পুরো ছাদটা আজ বাড়ির মেয়েবউ আর ছেলেপুলেদের দখলে। সেখানে সাউথ বক্সে গান বাজছে। একপাশে ছেলেরা নিজেদের মতো করে আড্ডা দিচ্ছে। অপর পাশে মেয়েরা বসেছে মেহেদী লাগাতে। ছোট বড় কেউ বাদ নেই। সবাই পার্লার থেকে আনা মেয়েগুলোকে ঘিরে ধরেছে নিজ নিজ হাত রাঙানোর উদ্দেশ্যে। হুমড়ি খেয়ে পড়ছে একে অপরের ওপর। পার্লার থেকে আগত মেয়েরাও সানন্দে দক্ষ হাতে সবার হাত রাঙিয়ে তুলছে বাহারী নকশা দিয়ে। নাচগান, হৈ-হুল্লোড়ে ছেয়ে গেছে বাড়ির প্রতিটি কোণা। আনাচকানাচে ছড়িয়ে পড়েছে আনন্দ। হাসির ঝংকার ভাসছে বাতাসে। পুরো বাড়ি, বাড়ির উঠোন, বাড়ি ঘিরে থাকা গাছপালা সবকিছুতে ঝুলছে রঙবেরঙের মরিচবাতি। চারিধারে লাল নীল আলোকরশ্মি ঠিকরে পরে বাড়ির সৌন্দর্য বাড়িয়েছে কয়েকগুণ। এত আয়োজনের মাঝেও একটা খুঁত ধরা পড়লো মায়মুনা বেগমের চোখে। পাক্কা গৃহিণী তিনি। কোনোকিছুই তাঁর নজর এড়ায় না। তিনি দেখলেন বাড়ির সদর দরজার ওপরে থাকা বাতিটা জ্বলছে না। ফলে ঐদিকটা একটু অন্ধকার দেখাচ্ছে। বোধহয় বাতিটার ফিউজ উড়ে গেছে। যদিও পুরো বাড়িটা আলোয় ঝলমল করছে তবুও জিনিসটা ভীষণ চোখে লাগছে ওনার। এই দরজা দিয়েই অতিথিরা বাড়ির ভেতরে আসা যাওয়া করছে। যদি সেখানকার লাইটটাই নষ্ট থাকে তাহলে কেমন দেখায়? মায়মুনা বেগম গলা চড়িয়ে বললেন “ইমরান, দরজার বাইরের লাইটটা পাল্টে ভালো একটা লাইট লাগা।”

মায়মুনা বেগম আদেশ দিয়েই রান্নাঘরের দিকে ছুটলেন। বাড়িতে উৎসব যাই হোক না কেন ঐ এক যুদ্ধক্ষেত্রে কোমর বেঁধে নামতে হয় ওনাকে। সাউন্ড বক্সে উচ্চস্বরে গান বাজছে। তাঁর ওপরে সবার মুখেই কথার ফুলঝুরি। এতোসবের মধ্যে ইমরান নামক মানুষটার কানে এ আদেশ পৌঁছালো কিনা কে জানে। এতো এতো আওয়াজ, হাসাহাসি আর কথার মাঝে ওনার চিৎকার হারিয়ে গেলো।

একটু পরে রান্নাঘরে হাজির হলো এক তরুণী। মায়মুনা বেগমের কাছে এসে বললো “বড় আম্মু, দরজার বাইরে লাইটটা জ্বলছে না। কাউকে বলো না ওটা পাল্টে দিতে। খারাপ দেখাচ্ছে তো।”

মায়মুনা বেগম কড়াইয়ে খুন্তি ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন “ইমরানকে না বললাম ওটা পাল্টে দিতে?”

তরুণী উত্তর দিলো “ভাইয়া তো বাসায় নেই। বাবুর্চিদের সঙ্গে কি নিয়ে যেন কথা বলতে গেছে।”

“রায়হান, ঐ ফাজিলটা কোথায় গেলো? যাতো গিয়ে খুঁজে দেখ।”

“সেও তো বাসায় নেই। বিকেলে বের হয়েছে এখনো আসেনি।”

মায়মুনা বেগম তেতে উঠলেন। চিড়চিড়ে গলায় বললেন “কাজের সময় একটাকেও হাতের কাছে পাওয়া যায় না। আজ আসুক বাসায়। বোনের বিয়ে অথচ সে গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরছে। হাতের কাছে পেলে এই খুন্তি দিয়ে পিটিয়ে সোজা করবো ওটাকে।

মায়মুনা বেগম থামলেন। পরপর দুটো শ্বাস ফেলে কাতর স্বরে বললেন “ও লাবিবা গিয়ে দেখ না কাউকে খুঁজে পাস কিনা।”

লাবিবা মৃদু হেঁসে বললো “বড় আম্মু তুমি এই ছোট্ট ব্যাপারটা নিয়ে এতো প্যানিক করছো কেন? লাইটটা কোথায় আছে আমাকে বলো। দেখি আমি কি করা যায়।”

“স্টোর রুমে গিয়ে দেখ পেয়ে যাবি।”

লাবিবা রান্নাঘর ছেড়ে দ্রুতপায়ে হেঁটে গেলো স্টোর রুমের দিকে। কর্মীক মেয়ে সে। ছোটাছুটি করে কাজ করতে ভালোই লাগে। কেউ কোনো কাজ দিলে যতক্ষণ না সেটা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারছে ততক্ষণ তাঁর শান্তি নেই।

 

আরহামকে নিয়ে সিএনজিটা এসে থামলো রায়হানের বাড়ির সামনে। ভাড়া মিটিয়ে দু’জনে হাঁটা ধরলো ভেতরের দিকে। চারিদিকের আলোকছটা চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। যত এগোচ্ছে ততই ভেতরের সোরগোল স্পষ্ট কানে বাড়ি খাচ্ছে। আরহামের ভিড়ভাট্টা তেমন পছন্দ না। ডিউটির কারণে সর্বক্ষণ চোখকান সজাগ রাখতে হয় তাঁকে। থাকেও নির্জন জনমানবশূন্য এলাকা বা পাহাড়ে। শক্ত বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়েও পুরোপুরি ঘুমানো হয়না। মস্তিষ্ক থাকে সচল। কান থাকে একেবারে খরগোশের মতো খাঁড়া। অল্প আওয়াজেই জেগে উঠতে হয়। হাত পা কোনকিছুকে তেমন বিশ্রাম দিতে পারে না। তাই ছুটির দিনগুলোতে যথাসম্ভব একা থাকে। ছাড়া হাত পা হয়ে অবসর সময়টাকে উপভোগ করে নিজের মতো করে। একাকীত্বের মাঝে খোঁজে নিজেকে। নিজের আনন্দকে। একা থাকতে থাকতে সেটাকেই ভীষণভাবে মনে ধরে এখন। এ কারণেই আসতে চায়নি এখানে। বাড়ির ভেতরে যেতে যেতে আরহাম বললো “এখানে কিছুক্ষণ থাকলেই আমার মাথা ব্যথা উঠে যাবে। কি সুন্দর পাহাড়ে উঠে বসে ছিলাম। তুই টেনেহিঁচড়ে এখানে নিয়ে এলি। আমার শান্তি নষ্ট করে কি সুখ পাস তুই?”

“চুপ কর তো। গিয়েছিলি তো সন্ন্যাসী হতে। আমি গিয়ে সংসারে ফিরিয়ে আনলাম। এমন মহৎকর্মের জন্য কোথায় আমাকে ধন্যবাদ দিবি তা না। ঘ্যানঘ্যান করছিস। এজন্যই বলে যেচেপড়ে কারোর উপকার করতে নেই।

“বহুত বড় উপকার করেছেন আপনি। এই উপকারের জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। ধন্যবাদ এভাবে আমার শান্তি নষ্ট করার জন্য।”

 

আরহামের খোঁচা মারা কথা গায়ে মাখলো না রায়হান। ব্যঙ্গাত্মক সুরে বললো “এখন এমন করছিস তো। আমি অভিশাপ দিচ্ছি, একটা সময় এমন আসবে তুই আমাদের বাড়িতে আসার জন্য বাহানা খুঁজবি। আমার পেছন পেছন ঘুরবি। আর সেদিন আমি তোকে পাত্তা দেবো না।”

আরহাম তাচ্ছিল্যের হাসি হেঁসে বললো “এমন দিন কখনো আসবে না। জানিস তো শকুনের দোয়ায় গরু মরে না।”

“তুই কি আমাকে শকুন বললি?”

“একদমই না। সিচুয়েশন বুঝে জাস্ট একটা প্রবাদবাক্য ইউজ করলাম।”

“সে তুই যাই বলিস, আমার মন বলছে, আমি শকুনের দোয়ায় তুই গরু নিশ্চয়ই মরবি। আই মিন আমার অভিশাপ ফলবে।”

ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আরহামকে গরু বলে বেজায় খুশি রায়হান। তবে সেই খুশির রেশ মুখে টানলো না। ধরা পড়লে রক্ষে নেই। আরহামকে জব্দ করতে পেরেছে ভেবে মনে মনে রাজ্য জয়ের হাসি হাসছে সে। তার এই হাসির মেয়াদ সীমিত। হতে পারে সে বুদ্ধিমান। তবে আরহামও তাঁর চেয়ে কম যায় না। ছোটবেলা থেকে সব বিষয়ে এককাঠি সরেস সে। আরহাম অগ্নি দৃষ্টিতে রায়হানের দিকে তাকিয়ে বললো “তুই আমাকে গরু বললি?”

রায়হান মেকি হেঁসে বললো “আরে দোস্ত, চেতিস ক্যান? আমি তোকে গরু বলিনি। জাস্ট তোর উদাহরণটা ভাঙিয়ে দিয়েছি যাতে তোর বুঝতে সুবিধা হয়।”

“তোর কি মনেহয়? আমি অবুঝ?”

“আরে না না। তুই অবুঝ কেন হতে যাবি। তুই তো সবসময় বেশি বেশি বুঝিস।”

আরেকটা সূক্ষ্ণ খোঁচা। প্রশংসার আড়ালে একটার পর একটা আঘাত হানছে শত্রুপক্ষ। আরহাম পাল্টা আক্রমণ করতেই যাবে এমন সময় রায়হান বললো “তবে যাই বল, অভিশাপটা ফলবে এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস। একেবারে মন থেকে দিয়েছি তো তাই।”

বলেই দাঁত ক’পাটি বের করে হাসলো রায়হান। আরহাম বিরস মুখে বললো “ তুই জেগে জেগে এসব আজগুবি স্বপ্নই দেখ।”

“জেগে জেগেই তো দেখবো। জানিস না জ্ঞানীজনেরা কি বলেন ‘স্বপ্ন সেটা নয় যেটা তুমি ঘুমিয়ে দেখো। স্বপ্ন সেটা যেটা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না। ঘুমিয়ে দেখলে আমার এই স্বপ্নটাও নিশ্চয়ই পূরণ হবে না?”

রায়হানের বরাবরের বদঅভ্যেস ভুল জায়গায় ভুল উদাহরণ টেনে আনা। আরহাম বিরক্ত গলায় বললো “কিসের সাথে কি বলছিস তুই? এইখানে কি এই মেটাফোর খাটে?”

“খাটে, খাটালেই খাটে। এখন জ্ঞান দেয়া বন্ধ কর তো।”

 

আরহাম আর কোনো কথা বললো না। অতিষ্ঠ ভঙ্গিতে দু’দিকে মাথা নেড়ে হাঁটতে লাগলো সামনের দিকে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন