#গল্প
শূন্য হৃদয়
আফছানা খানম অথৈ
মাস্টার্স শেষ করেছে তুষার। মেধাবী হলেও ভাগ্য যেন তার প্রতি একটু কৃপণ। একের পর এক চাকরির আবেদন, লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক সাক্ষাৎকার—সবকিছুতেই চেষ্টা চলছে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত চাকরির দেখা মিলছে না। তবু সে আশাবাদী। একদিন না একদিন সফলতা ধরা দিতেই হবে।
সেদিনও একটি প্রতিষ্ঠানের ইন্টারভিউ দিয়ে ক্লান্ত শরীরে বাসস্ট্যান্ডে এসে দাঁড়াল সে। বিকেলের শেষ আলো ধীরে ধীরে মলিন হয়ে আসছে। চারদিকে মানুষের ব্যস্ত আনাগোনা।
হঠাৎ তুষারের দৃষ্টি গিয়ে থামল এক তরুণীর ওপর।
মনে হলো, যেন শহরের ধুলোবালির ভিড়ে হঠাৎ কোনো রূপকথার রাজকন্যা নেমে এসেছে। হালকা আকাশি রঙের পোশাকে মেয়েটি ধীর পায়ে হেঁটে এসে বাসস্ট্যান্ডের বেঞ্চে বসল। অদ্ভুত এক মায়া ছড়িয়ে
আছে তার চোখে-মুখে।
অজান্তেই তুষারও গিয়ে একই বেঞ্চের একপাশে বসল। চোখ সরাতে চাইলেও পারল না।
মেয়েটি বিষয়টি টের পেয়ে মনে মনে বিরক্ত হলো।
— কী অদ্ভুত মানুষ! এভাবে কেউ তাকিয়ে থাকে? মনে হচ্ছে জীবনে কোনো মেয়েই দেখেনি!
কিছুক্ষণ নীরবতার পর সাহস সঞ্চয় করে তুষার বলল,
— হ্যালো… শুনছেন?
মেয়েটি প্রথমে কোনো উত্তর দিল না।
তুষার আবার বলল,
— শুনতে পাচ্ছেন?
মেয়েটি এবার শান্ত গলায় বলল,
— আমাকেই বলছেন?
— জি।
— বলুন, কী বলবেন?
তুষার একটু ইতস্তত করে বলল,
— আপনার সঙ্গে পরিচিত হতে পারি?
— হঠাৎ পরিচিত হতে চাইছেন কেন?
— আসলে… কোনো বিশেষ কারণ নেই। ভালো লাগল, তাই পরিচিত হতে ইচ্ছে হলো।
মেয়েটির ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
— আমার নাম তিশা। ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষে পড়ি। থাকি মিরপুর-১২।
তুষারের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
— সত্যি? আমিও তো মিরপুর-১২-তেই থাকি!
— তাই নাকি? আপনার নাম?
— আমি তুষার। মাস্টার্স শেষ করেছি। এখন চাকরির চেষ্টা করছি। আজও একটা ইন্টারভিউ দিয়ে ফিরছি।
— আশা করি খুব শিগগিরই চাকরি হয়ে যাবে। শুভকামনা রইল।
তুষার মুগ্ধ হয়ে বলল,
— ধন্যবাদ। আপনার শুভকামনাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
ঠিক তখনই বাস এসে থামল।দুজন পাশাপাশি উঠে বাসে উঠল। কথার ফাঁকে কখন যে পথ শেষ হয়ে গেল, কেউ বুঝতেই পারল না।বাস থেকে নেমে দুজনই অবাক।
একই ভবন!তুষার থাকে চতুর্থ তলায়, আর তিশারা পঞ্চম তলায়।দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে নিজ নিজ ফ্ল্যাটে চলে গেল।
এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই সিঁড়িতে, ছাদে কিংবা বাসস্ট্যান্ডে দেখা হতে লাগল। পরিচয় ধীরে ধীরে বন্ধুত্বে রূপ নিল। বন্ধুত্ব একসময় নিয়মিত ফোনালাপে গড়াল।
রাত গভীর হলে দুজনের গল্প যেন শেষই হতে চাইত না।
একসময় না বলেও দুজন দুজনের গল্প যেন শেষই হতে চাইত না।
একসময় না বলেও দুজন বুঝে গেল—তাদের হৃদয়ে একই নাম লেখা হয়ে গেছে।
ভালোবাসা কখন যে নিঃশব্দে দুজনের জীবনে জায়গা করে নিয়েছে, তা তারা নিজেরাও টের পায়নি।
কিন্তু তারা জানত না, ভাগ্য তাদের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প লিখে রেখেছে…।
ভালোবাসার দিনগুলো যেন স্বপ্নের মতো কেটে যাচ্ছিল। প্রতিদিন দেখা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে কথা, ছোট ছোট অভিমান, আবার মুহূর্তেই মান-অভিমান ভেঙে হাসি—সব মিলিয়ে তুষার আর তিশার পৃথিবী ছিল একে অপরকে ঘিরে।
কিন্তু বাস্তবতা বড় কঠিন।মাস্টার্স শেষ করার পরও তুষারের চাকরি হচ্ছিল না। বারবার ব্যর্থতা তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত সে সিদ্ধান্ত নিল বিদেশে যাওয়ার। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিল। ভাগ্য সহায় হলো—লটারিতে তার নাম উঠে গেল। অল্প দিনের মধ্যেই সে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাল।
বিদায়ের আগে তুষার তিশার হাত ধরে বলেছিল,
— আমার জন্য অপেক্ষা করবে তো?
তিশা চোখের জল লুকিয়ে বলেছিল,
— শুধু অপেক্ষা নয়, আমি তোমার স্বপ্নও আগলে রাখব। তুমি ফিরে এলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
হাজার মাইলের দূরত্ব ভালোবাসাকে থামাতে পারেনি। প্রতিদিন ভিডিও কলে কথা হতো। তুষার কাজের ফাঁকেও সময় বের করে ফোন করত। তিশাও তার প্রতিটি দিনের গল্প শোনাত।
এদিকে কলেজে তিশা ছিল সবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। তার সৌন্দর্য আর ব্যক্তিত্বে অনেকেই মুগ্ধ ছিল। প্রায়ই কেউ না কেউ লাল গোলাপ হাতে ভালোবাসার প্রস্তাব দিত। তিশা হাসিমুখে সব ফিরিয়ে দিত।কিন্তু সময় মানুষের মনেও পরিবর্তন আনে।
একসময় এক সহপাঠীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বাড়তে শুরু করল। বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে অন্য রূপ নিল। সেই সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে তিশা তুষারের ফোন এড়িয়ে চলতে লাগল। একদিন হঠাৎ তার মোবাইল নম্বরও বদলে গেল।
হাজার চেষ্টা করেও তুষার আর তিশার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারল না।
বিদেশের ব্যস্ত শহরে দাঁড়িয়ে সে প্রতিদিন পুরোনো নম্বরে ফোন দিত। প্রতিবারই একই উত্তর—
“এই নম্বরটি বর্তমানে বন্ধ আছে।”
তবুও তুষার বিশ্বাস হারায়নি।সে নিজেকে বলত,
— তিশা এমন করতে পারে না। নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে।
অন্যদিকে সেই নতুন সম্পর্কও বেশিদিন টিকল না। বিষয়টি তিশার বাবা-মায়ের নজরে এলো। অনেক বোঝানোর পর মেয়েকে সেই সম্পর্ক থেকে ফিরিয়ে আনলেন তারা।
ঠিক তখনই ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলো।তিশা দারুণ ফল করল।মেয়ের সাফল্যে তার বাবা নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন।
— আমার মেয়েকে আমি ডাক্তার বানাব।
সেই স্বপ্ন নিয়েই তাকে মেডিকেল ভর্তি কোচিংয়ে ভর্তি করালেন। প্রতিদিন নিজে নিয়ে যেতেন, আবার নিয়ে আসতেন। মেয়ের ভবিষ্যৎই যেন ছিল তাঁর জীবনের
জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।কিন্তু মানুষের সব স্বপ্ন পূরণ হয় না।ভর্তি পরীক্ষার ফল বেরোল।তিশা সুযোগ পেল না।
মেয়ের ব্যর্থতা নিজের ব্যর্থতা মনে করে ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়লেন বাবা। দুশ্চিন্তা আর মানসিক চাপ ধীরে ধীরে তাঁর শরীরকে গ্রাস করতে লাগল।
একদিন হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা আর বুকে অসহ্য জ্বালা নিয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলো।
জরুরি বিভাগের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে তিশা শুধু একটাই কথা বলছিল—
— আল্লাহ, আমার আব্বুকে সুস্থ করে দিন। আমি আর কিছু চাই না…
কয়েক মিনিট পরে চিকিৎসক বেরিয়ে এলেন।তিশা ছুটে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— ডাক্তার সাহেব, আমার পাপ্পু কথা বলছে না কেন? ওকে ভালো করে দিন… প্লিজ…,
চিকিৎসক কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর ভারী কণ্ঠে পরিবারের সদস্যদের দিকে তাকিয়ে বললেন—
— আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি… কিন্তু তাঁকে আর বাঁচাতে পারিনি।
মুহূর্তেই যেন তিশার পৃথিবী থেমে গেল।যে মানুষটি ছিল তার সাহস, আশ্রয় আর স্বপ্নের ভিত্তি—তিনি আর নেই।
সেদিন শুধু একজন বাবা মারা যাননি; ভেঙে গিয়েছিল একটি পরিবারের স্বপ্ন, আর একটি মেয়ের জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ ছায়াটিও হারিয়ে গিয়েছিল।
বাবার মৃত্যুর পর মুহূর্তেই বদলে গেল তিশাদের সংসার।
যে মানুষটি এতদিন পরিবারকে আগলে রেখেছিলেন, তাঁর অনুপস্থিতিতে নেমে এল অনিশ্চয়তার অন্ধকার। সংসারের আয় বন্ধ হয়ে গেল। একসময় যেসব আত্মীয় তাঁর বাবার সাহায্যে লেখাপড়া করেছেন, প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তারাই ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করলেন।
তিশার মা নীরবে সব অপমান সহ্য করতেন। দুই মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিবাদ করার সাহসও যেন হারিয়ে ফেলেছিলেন। কথায় কথায় তাঁকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হতো, অথচ তিনি শুধু চোখের জল লুকিয়ে রাখতেন।
বাবার শূন্যতা আর সংসারের দুঃসহ বাস্তবতায় তিশা ভেঙে পড়ল। লেখাপড়া ছেড়ে দেওয়ার কথাও একসময় তার মনে এলো। কিন্তু বাবার শেষ স্বপ্নের কথা মনে পড়তেই বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
এক গভীর রাতে হঠাৎ তার মনে পড়ল তুষারের কথা।
অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের পর সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে
তুষারকে একটি ছোট্ট বার্তা পাঠাল—
“কেমন আছ?”
দূর আমেরিকায় তখন গভীর রাত।ফোনে বার্তার শব্দ শুনে তুষার স্ক্রিনে তাকাতেই স্তব্ধ হয়ে গেল।
তিশা!
যে নামটি ভুলতে পারেনি, যে মানুষটির জন্য প্রতিটি দিন অপেক্ষা করেছে, সেই মানুষটি আবার ফিরে এসেছে।এক মুহূর্তও দেরি না করে সে উত্তর দিল।
তারপর শুরু হলো দীর্ঘ ফোনালাপ।সব শুনে তুষার কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর শান্ত কণ্ঠে বলল,
— জীবনে এমন কিছু ক্ষতি আছে, যা কখনো পূরণ হয় না। কিন্তু তোমার বাবা নিশ্চয়ই চাইতেন না তুমি ভেঙে পড়ো। তাঁর স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখাই হবে তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড় ভালোবাসা।তিশার চোখ ভিজে উঠল।
— আমি আর পারছি না, তুষার। সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে।
— পারবে। আমি আছি। তুমি শুধু হাল ছেড়ো না। আবার পড়াশোনা শুরু করো। নিজের জন্য, তোমার বাবার স্বপ্নের জন্য।
তুষারের কথাগুলো যেন নতুন করে বাঁচার সাহস দিল তিশাকে।পরের বছর সে অনার্সে ভর্তি হলো।
বিদেশে থেকেও তুষার নিয়মিত তার পড়াশোনার খোঁজ নিত। নিজের উপার্জন থেকে একটি স্মার্টফোন কিনে পাঠাল, পড়াশোনার খরচও গোপনে বহন করতে লাগল।
তিশার পরিবারের কেউ জানত না—নিঃস্বার্থভাবে একজন মানুষ দূরদেশে বসে তাদের মেয়েটির স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তুষারের চাকরি, আয় এবং অবস্থান আরও ভালো হতে লাগল। কিন্তু তার জীবনে একটি জিনিস বদলায়নি—তিশার প্রতি ভালোবাসা।
এদিকে দেশে তুষারের পরিবার বিয়ের জন্য চাপ দিতে শুরু করল।
একদিন মা বললেন,
— তোর বয়স তো কম হলো না। এবার সংসার কর।
তুষার দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল,
— আমি বিয়ে করব, তবে শুধু তিশাকে। অন্য কাউকে নয়।
বাবা ছেলের সিদ্ধান্তে আপত্তি করলেন না।কিন্তু মা রাজি হলেন না।
তাঁর আপত্তির কারণ ছিল সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক বংশ এবং দুই পরিবারের অবস্থানের পার্থক্য।
তিনি মনে করতেন, পাশাপাশি ফ্ল্যাটে বড় হওয়া মেয়েকে বউ করে আনলে নানা সমস্যার সৃষ্টি হবে। উপরন্তু, তাঁদের সামাজিক পরিচয়ও এক নয়।কিন্তু ভালোবাসা তো হিসাব মেনে চলে না।
তুষার জানত, জীবনের সব অর্জন অর্থ দিয়ে মাপা যায় না। কিছু মানুষকে শুধু হৃদয় দিয়েই পাওয়া যায়।আর সেই হৃদয়ের একমাত্র অধিকারিণী ছিল তিশা।রাত গভীর হলে আবারও ভিডিও কলে কথা হতো দুজনের।
এক রাতে তুষার বলল,
— আর কতদিন এভাবে দূরে থাকব? তোমাকে ছাড়া প্রতিটি দিন অসম্পূর্ণ লাগে।
তিশা মৃদু হেসে বলল,
— আর একটু ধৈর্য ধরো। আমি চাই, আমাদের বিয়ে হোক সবার দোয়া আর আশীর্বাদ নিয়ে।
তুষার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— ঠিক আছে। আমি ঘটকের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে তোমাদের বাসায় প্রস্তাব পাঠাব।
তিশার চোখে তখন নতুন স্বপ্নের আলো।সে বিশ্বাস করেছিল, এত বাধা পেরিয়ে এবার হয়তো তাদের ভালোবাসা পূর্ণতা পাবে।কিন্তু ভাগ্য তখনও তাদের জন্য অন্য এক অধ্যায় লিখে রেখেছিল..,
তুষার আর দেরি করল না। পরিবারের সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখেই সম্পর্ককে পরিণতি দিতে চাইল। তাই একজন ঘটকের মাধ্যমে তিশাদের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠাল।
কিন্তু তিশার মা প্রস্তাবটি শুনেই কঠোর হয়ে উঠলেন।
— শুধু টাকা থাকলেই মানুষ বড় হয় না। আমার মেয়ের জন্য শিক্ষিত, সম্মানিত পরিবারের ছেলে চাই। এই বিয়ে আমি কোনোভাবেই মেনে নেব না।
ঘটক অপমানিত হয়ে ফিরে এলেন।তুষার খবরটি শুনে ভেঙে পড়লেও আশা ছাড়ল না। সে বিশ্বাস করত, সময়ই একদিন সব বদলে দেবে।সেদিন রাতে ভিডিও কলে তিশা বলল,
— মন খারাপ কোরো না। আমি মাকে বুঝিয়ে রাজি করাব। তিনি রাগ করেছেন, কিন্তু একদিন নিশ্চয়ই আমাদের ভালোবাসার মূল্য বুঝবেন।
তুষার মৃদু হেসে বলল,
— আমি তোমার ওপর বিশ্বাস রাখি। কিন্তু যদি শেষ পর্যন্ত আন্টি রাজি না হন?
তিশা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— আগে শেষ চেষ্টা করি। তারপরও যদি না মানেন, তখন আমরা সিদ্ধান্ত নেব।
এরপরও কয়েকবার ঘটকের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠানো হলো। প্রতিবারই তিশার মা নানা অজুহাতে বিষয়টি এড়িয়ে গেলেন।অবশেষে তুষারের অনুরোধে তিশা তার এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবীকে সব খুলে বলল। বান্ধবী ফোন করে তিশার মায়ের সঙ্গে কথা বলল।
সেদিন প্রথমবারের মতো তিশার মা সরাসরি মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন,
— তুই কি সত্যিই তুষারকে ভালোবাসিস?
তিশা অনেকক্ষণ নীরব থেকে বলল,
— হ্যাঁ, মা। আমি ওকে ভালোবাসি। ও শুধু আমার ভালোবাসার মানুষ নয়, আমার সবচেয়ে বড় ভরসা। বাবা চলে যাওয়ার পর সবাই যখন দূরে সরে গিয়েছিল, তখন ও-ই আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল।
মেয়ের কণ্ঠের আন্তরিকতা শুনে মা কিছুটা নরম হলেন।
তিনি শান্ত গলায় বললেন,
— আমি তো শুধু তোর ভালো চাই। আমাকে একটু সময় দে। পরিবারের সবার সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেব।
মায়ের এই কথায় তিশার মনে নতুন আশার আলো জ্বলে উঠল।
সেই রাতেই সে আনন্দে তুষারকে ফোন করল।
— জান, মনে হচ্ছে মাম্মি রাজি হবেন। তুমি আবার প্রস্তাব পাঠাও।
তুষারের বুকেও আশার ঢেউ উঠল।পরদিনই আবার ঘটক গেলেন।এবার তিশার মা তাঁকে অপমান করলেন না। শুধু বললেন,
— বিয়ে-শাদির মতো বিষয়ে সময় লাগে। পরে আপনাদের জানাব।
এই উত্তর শুনে তুষার ভেবেছিল, হয়তো সব বাধা কাটতে চলেছে।কিন্তু বাস্তবে অন্য এক পরিকল্পনা চলছিল।
তিশার মায়ের অজান্তে নয়, বরং তাঁর সিদ্ধান্তেই দ্রুত অন্য একটি পাত্র খোঁজা শুরু হলো। আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় অল্প সময়ের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে গেল। বিয়ের দিন-তারিখও নির্ধারণ করা হলো।
কিন্তু পুরো বিষয়টি তিশার কাছ থেকে গোপন রাখা হলো।
তখন তিশা হোস্টেলে থেকে অনার্সের পড়াশোনা করছিল।একদিন তার চাচা হঠাৎ এসে বললেন,
— তোর মায়ের শরীর খুব খারাপ। তাড়াতাড়ি বাড়ি চল।
মায়ের অসুস্থতার কথা শুনে তিশা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।
পথজুড়ে শুধু একটাই চিন্তা—মা যেন ভালো থাকেন।
কিন্তু বাড়িতে পৌঁছে সে যা দেখল, তার জন্য সে একেবারেই প্রস্তুত ছিল না।
চারদিকে আলোকসজ্জা, অতিথিদের ভিড়, উঠোনে সাজানো বিয়ের মঞ্চ।
আর মাঝখানে… বরের সাজে বসে আছে এক অচেনা যুবক।
মুহূর্তেই তিশার চারপাশ যেন অন্ধকার হয়ে গেল।
সে মায়ের দিকে অসহায় চোখে তাকাল।কিন্তু কোনো উত্তর পেল না।
কিছু বলার আগেই তাকে কনের ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো।
নীরব চোখের জল আর ভাঙা হৃদয় নিয়েই সে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হলো।
তিশার বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো নিঃশব্দে। চারদিকে উৎসবের আমেজ, আত্মীয়স্বজনের কোলাহল, শুভেচ্ছা আর হাসির ঝলক—কিন্তু সেই হাসির ভিড়ে তিশার মুখে ছিল না একফোঁটা আনন্দ। চোখের জলও যেন শুকিয়ে গিয়েছিল।
বিদায়ের মুহূর্তে সে একবার শুধু মায়ের দিকে তাকিয়েছিল। সেই দৃষ্টিতে ছিল হাজারো প্রশ্ন, হাজারো অভিমান। কিন্তু কোনো প্রশ্নেরই উত্তর মেলেনি।
বিয়ের গাড়ি ধীরে ধীরে বাড়ির আঙিনা ছেড়ে দূরে মিলিয়ে গেল।
অন্যদিকে হাজার মাইল দূরে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মব্যস্ত তুষার হঠাৎ এক বন্ধুর ফোন পেল।
— তুষার… একটা খারাপ খবর আছে।
তুষারের বুক কেঁপে উঠল।
— কী হয়েছে?
— তিশার বিয়ে হয়ে গেছে।
মাত্র চারটি শব্দ।কিন্তু সেই চারটি শব্দ যেন বজ্রপাত হয়ে আঘাত করল তার হৃদয়ে।মোবাইলটি হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গেল।
কিছুক্ষণ সে নিশ্চুপ বসে রইল। চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল বাসস্ট্যান্ডের সেই প্রথম দেখা, একই ভবনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে লাজুক হাসি, গভীর রাতের ভিডিও কল, অসংখ্য স্বপ্ন আর একসঙ্গে পথ চলার প্রতিশ্রুতি।
সবকিছু যেন মুহূর্তের মধ্যে ধুলোয় মিশে গেল।তবুও সে তিশাকে দোষ দিল না।নিজের মনকে বলল,
— হয়তো পরিস্থিতিই তাকে হারিয়ে দিয়েছে। মানুষ নয়, ভাগ্যই আমাদের আলাদা করে দিল।
সেদিন গভীর রাতে তুষার একা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশভরা তারা, অথচ তার জীবনে নেমে এসেছে ঘন অন্ধকার।যে হৃদয়ে একদিন তিশার ভালোবাসা ছিল, সেখানে আজ শুধু নীরবতা।শুধু শূন্যতা।
পরদিন ছুটি নিয়ে দীর্ঘ সময় নিজের মধ্যে গুটিয়ে রইল। অফিসের সহকর্মীরা বহুবার খোঁজ নিলেও সে কারও সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারল না।
সে বুঝে গেল—জীবনের সব ক্ষত চোখে দেখা যায় না। কিছু ক্ষত মানুষ বয়ে বেড়ায় শুধু হৃদয়ের গভীরে।
কয়েক দিন পর আবার কর্মস্থলে ফিরে গেল তুষার।
মুখে আগের মতো হাসি থাকলেও, সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে রইল এক অসমাপ্ত প্রেমের ইতিহাস।
অন্যদিকে নতুন সংসারে থেকেও তিশা মাঝে মাঝে গভীর রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবত—
“কিছু ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না, তবু সারাজীবন হৃদয়ের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটুকু দখল করে থাকে।”
হয়তো তারা একে অপরকে আর কোনো দিন খুঁজে পাবে না।
তবু দুজনের জীবনের এক কোণে থেকে যাবে কিছু অপূর্ণ স্বপ্ন, কিছু অব্যক্ত কথা আর এক মুঠো স্মৃতি।
কারণ প্রথম ভালোবাসা মানুষ ভুলে যেতে পারে, কিন্তু হৃদয় কখনো তাকে মুছে ফেলতে পারে না।
সেই প্রথম ভালোবাসার স্মৃতি বুকে নিয়েই তুষার বেঁচে রইল।
আর তার হৃদয়ের যে জায়গাটুকু একদিন তিশার জন্য নিবেদিত ছিল, সেখানে আর কেউ কোনো দিন জায়গা পেল না।সেই হৃদয় চিরদিনের জন্য রয়ে গেল—
একটি “শূন্য হৃদয়”।
—সমাপ্ত–
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন