• রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৫ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
কালীগঞ্জে ১২ বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও গর্ভপাতের অভিযোগ, আটক ৩ মাদক বিরোধী অভিযানে মাদক কারবারি আটক করে থানায় আসার সময় এস আই সহ নিহত ২ আহত ২ জন মোঃ মুক্তাদির হোসেন, বাংলাদেশ কবিতা সংসদের সাহিত্য সম্মেলন প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত কবিতা: সমাজের আয়না সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়েই আমরা এ সমাজে বসবাস করি: ফজলুল হক মিলন এমপি দুর্গাপূজার মণ্ডপে মণ্ডপে এমপি মিলন, দিলেন পাশে থাকার আশ্বাস তুমুলিয়া ইউনিয়নের ইতিহাসে প্রথম নারী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শিখা বেগম কবিতা:মায়ার পৃথিবী, সত্যের স্রষ্টা — একটি আত্মোপলব্ধির কবিতা রচনায়: মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম তারিখ:১৬/১০/২০২৬ স্বী স্ত্রীর রমীমা মাদক ব্যবসা কালীগঞ্জে ১ কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তার ১, কালীগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ীদের উদ্যেগে ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত

গল্পঃ আগমনী, লেখিকাঃ তামান্না রওশনারা, দৈনিক বাংলার কথা,

বাংলার কথা ডেস্ক / ৬৪ বার পঠিত
আপডেটঃ বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আগমনী
তামান্না রওশনারা

শহরের এক অগোছালো, প্রাণহীন ক্ষুদ্র পরিসরে আমার একাকী জীবনের বসবাস। এই জীবনে প্রাপ্তির হিসাব খুবই সামান্য; অথচ অপ্রাপ্তির বিস্তার সীমাহীন। ব্যর্থতাগুলো যেন সফলতার সীমানা অতিক্রম করে মহাকাশের নক্ষত্রের মতো অনন্ত শূন্যতাজুড়ে ছড়িয়ে আছে।

আমার নিঃসঙ্গ গৃহটাই আজ আমার সমগ্র পৃথিবী। চারদিকে নীরবতা, ভেতরে ঘন অন্ধকার। কখনো কখনো মনে হয়, এই অন্ধকারেরও প্রাণ আছে। সে নীরবে আমার পাশে বসে থাকে, আমার দীর্ঘশ্বাস গুনে, আমার না-বলা কথাগুলো শুনে যায়। তার মুখ কোনো ভাষা নেই; তবু সে-ই আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত বক্তা ও শ্রোতা।

ব্যস্ততা বলতে আমার জীবনে তেমন কিছুই নেই। অথচ মানুষের সঙ্গে বসে দু’দণ্ড কথা বলার অবকাশও যেন কোনো দিন হয়ে ওঠে না। আসলে মানুষের কাছে নিজের মনের ভাষা প্রকাশ করার সাহস বহু আগেই হারিয়ে ফেলেছি। তাই বইয়ের পাতার ভাঁজেই খুঁজে নিয়েছি আমার নীরব আত্মীয়দের।

কখনো সমরেশ মজুমদারের চরিত্রগুলো আমার নিঃসঙ্গতার সঙ্গী হয়। কখনো রবীন্দ্রনাথের দর্শন আমাকে জীবনের অর্থ খুঁজতে শেখায়। জসীমউদ্দীনের শব্দে পাই মাটির গন্ধ, আর শরৎচন্দ্রের চরিত্রগুলোর মধ্যে খুঁজে পাই সমাজের নিষ্ঠুরতম মুখ। মনে হয়, তারা কেউ লেখক নন—আমার বহুদিনের পরিচিত মানুষ, যারা নিঃশব্দে এসে আমার পাশে বসে গল্প করে।

বইগুলোও যখন একসময় নীরব হয়ে যায়, তখন ডায়েরির সাদা পাতাগুলো আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। আমি কলম তুলে নিই। মানুষের কাছে যা বলতে পারিনি, কাগজের কাছে তা অকপটে স্বীকার করি। কারণ মানুষ বিচার করে, কাগজ কখনো করে না। কাগজ শুধু ধারণ করে—অশ্রু, দীর্ঘশ্বাস আর ভাঙা স্বপ্নের ইতিহাস।

আমার বাসার সামনেই একটি বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ। শহরের প্রতিটি বাড়ির অপ্রয়োজনীয় জিনিস এসে জমা হয় সেখানে। ভাঙা কাচ, ছেঁড়া কাপড়, পচে যাওয়া স্মৃতি আর মানুষের অবহেলায় ফেলে দেওয়া অসংখ্য বস্তু। অনেক সময় জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মনে হয়, সেই মাঠ আর আমার জীবনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

দক্ষিণের জানালাটি বহু বছর ধরে বন্ধ। কেন বন্ধ করেছি, আজ আর মনে নেই। হয়তো একদিন আলোও আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তাই তার পথটুকুও বন্ধ করে দিয়েছি।

শুধু উত্তরের জানালাটি আজও খোলা।
জানালার ঠিক ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন বটগাছ। তার বিস্তৃত শাখা-প্রশাখাজুড়ে শত শত কাকের সংসার। ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই তারা একযোগে ডেকে ওঠে। একসময় সেই ডাক আমার ভীষণ বিরক্তির কারণ ছিল। এখন আর নয়। আজ সেই শব্দের ভেতরেও আমি জীবনের স্পন্দন খুঁজে পাই। তাদের কোলাহল আমাকে মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীতে এখনো কিছু প্রাণ আছে, যারা প্রতিদিন ফিরে আসে নিজের নীড়ে।

শুধু একটি আফসোস আজও রয়ে গেছে।
ইচ্ছে হয়নি কোনো দিন কাকগুলোর সঙ্গে গল্প করতে।
কারণ আমি জানি, মানুষের ভাষা শিখেও মানুষ মানুষকে বোঝে না; সেখানে পাখিরা আমার নিঃশব্দ জীবন বুঝবে—এমন আশা করাও বোধ হয় বিলাসিতা।

প্রতিদিনের মতোই ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে সংবাদপত্রওয়ালা দরজার নিচ দিয়ে একটি পত্রিকা গলিয়ে দিয়ে চলে গেল। আমি ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে পত্রিকাটি হাতে তুলে নিলাম। । পত্রিকার পাতা খুলতেই চোখে পড়ে অসংখ্য সংবাদ। কোথাও বিজয়ের উল্লাস, কোথাও মৃত্যুর মিছিল; কোথাও নতুন জীবনের সূচনা, কোথাও আবার স্বপ্নভঙ্গের আর্তনাদ। অধিকাংশ সংবাদ চোখের সামনে দিয়ে চলে যায়, কিছু সংবাদ আবার মুহূর্তের জন্য মনকে ভারী করে তোলে।

হঠাৎ একসঙ্গে শত শত কাকের ডানা ঝাপটানোর শব্দে চমকে উঠলাম। মনে হলো, যেন অদৃশ্য কোনো আতঙ্ক মুহূর্তেই পুরো বটগাছটাকে গ্রাস করে ফেলেছে। কৌতূহল সামলাতে না পেরে ধীরে ধীরে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
জানালার ওপাশে, বিশাল বটগাছটির ছায়ায় বসে আছে মধ্যবয়সী এক নারী। এলোমেলো চুলগুলো বাতাসে উড়ছে, শুকিয়ে যাওয়া মুখে জীবনের সমস্ত ক্লান্তির ছাপ। দু’চোখ বেয়ে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, অথচ মুখে কোনো শব্দ নেই। কান্নারও যেন ভাষা ফুরিয়ে গেছে ।
নারীটি নিশ্চুপ হয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে বসে আছে। তার চোখে ছিল এমন এক শূন্যতা, যেন পৃথিবীর সব আপনজনকে হারিয়ে সে শেষ আশ্রয় খুঁজতে এসে বসেছে এই পুরোনো বটগাছের নিচে। তাকে দেখে আমার বুকের ভেতর অকারণে এক অদ্ভুত ব্যথা জমে উঠল। মনে হলো, এই নারী শুধু একা নয়—তার সঙ্গে বসে আছে অগণিত না-বলা গল্প, অপমান, প্রতারণার ইতিহাস।

আমি ভীষণ স্বার্থপর একজন মানুষ। মানুষের কান্না এখন আর আমার হৃদয়কে স্পর্শ করে না। কারণ আমি জেনে গেছি—জীবন মানেই ক্ষণিকের সুখ, ক্ষণিকের দুঃখ। আজ যে মানুষ শোকে ভেঙে পড়েছে, কাল সেই মানুষই হয়তো হাসবে। আবার যে আজ হাসছে, সময়ের নিষ্ঠুর পরিহাসে কাল তার চোখও অশ্রুতে ভিজবে।
এই পৃথিবীতে দুঃখ স্থায়ী নয়, সুখও নয়। ঋতুর মতোই তারা আসে, কিছুক্ষণ থামে, তারপর নীরবে চলে যায়। মানুষ শুধু সাময়িক অনুভূতিগুলোকে চিরস্থায়ী ভেবে ভুল করে। তাই আজ আর কারও কান্না দেখে আমি সহজে বিচলিত হই না। জানি, সময়ের চেয়ে বড় সান্ত্বনাদাতা আর কেউ নেই। সে একদিন সব ক্ষত শুকিয়ে দেয়, আবার নতুন কোনো ক্ষতের জন্মও দেয়।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো। চারদিকে একে একে মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আসছে। প্রকৃতি যেন দিনের সমস্ত কোলাহল গুটিয়ে নিয়ে এক অনির্বচনীয় প্রশান্তিতে ডুবে গেছে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ বটগাছজুড়ে অদ্ভুত এক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ল।

শত শত কাক একসঙ্গে এমন করুণ স্বরে ডেকে উঠল, যেন তারা কোনো অদৃশ্য বিপদের আগাম সংবাদ দিচ্ছে। তাদের ডানার প্রচণ্ড ঝাপটায় মুহূর্তেই গাছের নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল।
আমি বিস্ময়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
জানালার ওপাশের দৃশ্য দেখে বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
সেই মধ্যবয়সী নারী… ধীরে ধীরে নিজের পরনের শাড়িটি খুলে বটগাছের একটি মোটা ডালে জড়িয়ে নিচ্ছে। তার হাত কাঁপছে, অথচ চোখে কোনো ভয় নেই। সে অনেক আগেই মৃত্যুকে মেনে নিয়েছে; আজ শুধু আনুষ্ঠানিক বিদায়টুকু বাকি।

এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থেমে গেল।
আমার বহু বছরের জমাটবাঁধা পাষাণ হৃদয় আর নির্বিকার থাকতে পারল না।
দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছা-নির্বাসিত নীরবতা ভেঙে আমি ছুটে গেলাম।
আমার পায়ের শব্দ শুনে নারীটি আচমকা চমকে উঠল। তাড়াতাড়ি শাড়ির আঁচল বুকের কাছে টেনে নিয়ে ভীত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “কে… কে আপনি?”

আমি তার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলাম না। ধীরে ধীরে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বটগাছের ডালে বাঁধা শাড়িটির দিকে একবার তাকিয়ে আবার তার চোখের দিকে চাইলাম।

কিছুক্ষণ নীরব থেকে শান্ত কণ্ঠে বললাম,
— “মৃত্যু সাহসীদের শেষ আশ্রয় নয়। পরাজিত মানুষ মৃত্যুকে বেছে নেয় না; সে আবার দাঁড়াতে শেখে। জীবন যুদ্ধক্ষেত্র নয়, জীবন একটি পাঠশালা। এখানে প্রতিটি আঘাত একটি শিক্ষা, প্রতিটি ব্যর্থতা একটি নতুন অধ্যায়। যে মানুষ কষ্ট সহ্য করতে শেখে না, সে জীবনের আসল অর্থও কখনো শিখতে পারে না।”

নারীটি নিশ্চুপ হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
আমি আবার বললাম,
— “তুমি আজ মরতে চাও। কিন্তু ভেবেছ কি, তোমার মৃত্যুর পর পৃথিবী এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকবে না? আগামীকালও সূর্য উঠবে, মানুষ কাজে যাবে, সন্ধ্যায় আবার আজান হবে।
তার চোখ বেয়ে নীরবে জল গড়িয়ে পড়ল।
আমি আরেক পা এগিয়ে গিয়ে বললাম,
— “নিজেকে হত্যা করার আগে একবার ভেবে দেখো—তুমি কি সত্যিই জীবনকে হারাচ্ছো, নাকি শুধু কিছু নিষ্ঠুর মানুষদের জিততে দিচ্ছ?”

হঠাৎই মেয়েটি ভেঙে পড়ল। কোনো দ্বিধা না করেই আমার বুকের ওপর মাথা রেখে অঝোরে কাঁদতে লাগল। সেই কান্নায় ছিল না কোনো শব্দ, ছিল শুধু বুকফাটা আর্তনাদ। মনে হলো, বহুদিন ধরে জমে থাকা সব যন্ত্রণা এক মুহূর্তে অশ্রু হয়ে ঝরে পড়ছে।

আমি ধীরে ধীরে তার কাঁধে হাত রাখলাম।
অনেকক্ষণ পর সে একটু শান্ত হলো। আমি মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করলাম,
— “কী হয়েছে তোমার?”

সে চোখের জল মুছে আমার দিকে তাকাল। ঠোঁট কাঁপছিল, শব্দ বের হতে চাইছিল না।
অবশেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— “আমি ভীষণভাবে ঠকে গেছি…”
কথাটা বলেই আবার মাথা নিচু করে ফেলল।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার বলল,
— “আমার বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে। চার বছরের ভালোবাসা… তারপর চার মাসের সংসার। এই চার মাসে আমি আমার সবটুকু দিয়ে একজন মানুষকে আগলে রাখতে চেয়েছিলাম। নিজের স্বপ্ন, নিজের ইচ্ছে, নিজের অহংকার আত্মসম্মান—সব তার পায়ের কাছে রেখে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, তাকে ধরে রাখতে পারে।

সে কাঁপা কণ্ঠে বলতে শুরু করল—
“পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, সমাজ—সবার বিরোধিতা করে উপেক্ষা করে আমি তাকে বিয়ে করেছিলাম। ভেবেছিলাম, ভালোবাসা একদিন সব বাধা জয় করবে। নিজের পরিবার ছেড়েছি, আপন মানুষদের কষ্ট দিয়েছি, শুধু একজন মানুষকে বিশ্বাস করে। অথচ আজ সেই মানুষটিই অন্য এক নারীর মোহে আমাকে ফেলে চলে গেছে।

চলে যাওয়ার আগে সে শুধু আমার হাত ছাড়েনি; আমার সম্মানটুকুও কেড়ে নিয়েছে। পুরো পৃথিবীর সামনে আমাকে চরিত্রহীনা বলে অপবাদ দিয়েছে। যে মানুষটির জন্য সবকিছু বিসর্জন দিয়েছিলাম, সেই মানুষটিই আমার চরিত্রের বিচারক হয়ে দাঁড়াল।

তার মায়ের অর্থ, প্রভাব আর ক্ষমতার কাছে আমার সত্য পরাজিত হয়েছে । টাকা যেন আমার চরিত্রের রায় লিখে দিল। আমি নির্দোষ ছিলাম, আমি চরিত্র হীনা নই।

আর সমাজ…? সমাজ কখনো সত্য জানতে চায় না। তারা বিচার করে না, শুধু রায় ঘোষণা করে। কেউ একবারও জানতে চাইল না আমার অপরাধ কী ছিল। সবাই মিলে আমার গায়ে এমনভাবে কলঙ্কের কালি মেখে দিল, যেন আমি জন্ম থেকেই অপরাধী। আমার নামটুকুও কেড়ে নিয়ে আমাকে বারবণিতার মতো ঘৃণার চোখে দেখতে শুরু করল। আমি যেন খুব সহজলভ্য।

বলুন তো, একজন নারীর চরিত্র কি এতটাই সস্তা, যে ক্ষমতাবান মানুষের একটি মিথ্যা অভিযোগেই তা ধুলোয় মিশে যায়?”

সে আবার ভেঙে পড়ল। দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

— “এখন মৃত্যুই আমার একমাত্র আশ্রয়। এই পৃথিবীতে আর কোথাও আমার জন্য কোনো ঘর নেই… কোনো মানুষ নেই… কোনো পরিচয় নেই।”

আমি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে তার কান্না শুনলাম। কান্না মানুষের হৃদয়কে শক্তিশালী করে। তারপর শান্ত কণ্ঠে বললাম,

— “না… মৃত্যু কখনো আশ্রয় হতে পারে না।

সে নিঃশব্দে আমার দিকে তাকালো।

আমি ধীরে ধীরে বললাম,

— “চলো, আমার সঙ্গে চলো। এই নির্জন অন্ধকার বাড়িটাই আজ থেকে তোমার আশ্রয় হোক। দেখো, চারদিকে কত নিস্তব্ধতা! দূর-দূরান্ত পর্যন্ত কোনো বসতি নেই, নেই মানুষের কোলাহল। এখানে কেউ তোমার অতীত জানতে চাইবে না, কেউ তোমার চরিত্রের বিচার করবে না, কেউ তোমার ক্ষতগুলোকে আঙুল দিয়ে দেখাবে না।”

আমি আবার বললাম,

— “তবে আমাকে একটি কথা দিতে হবে।”

— কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল “কী কথা”?

আমি গভীরভাবে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম,

— “একবার যে জীবনকে বিদায় জানিয়ে নতুন পথে পা বাড়াবে, আর কোনো দিন ফিরে গিয়ে সেই অতীতকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করবে না। মানুষ অতীতকে স্মরণ করতে পারে । যে সুখ কিংবা যে দুঃখ একদিন পেছনে ফেলে আসতে হয়, তাকে আবার বুকে জড়িয়ে ধরতে গেলে নতুন জীবনও একদিন অতীত হয়ে যায়।” আর আমার অন্ধকার গৃহে কখনো আলো জ্বালাবে না।

বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো সম্পূর্ণ নিভে গেছে। অন্ধকার ধীরে ধীরে চারপাশ গ্রাস করছে।

নারীটি দীর্ঘক্ষণ নীরব থেকে মাথা নিচু করল।

মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।

আমি তাকে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে বললাম। তারপর ঘরের ভেতরে গিয়ে আলমারি খুলে একটি পরিষ্কার শাড়ি, একটি গামছা আর প্রয়োজনীয় কিছু কাপড় নিয়ে এসে তার হাতে তুলে দিলাম।

মৃদু স্বরে বললাম,

— “বাড়ির পেছনে একটি পুকুর আছে। সেখানে গিয়ে ভালো করে স্নান করে এসো।
সে নীরবে আমার হাত থেকে কাপড়গুলো নিয়ে ধীর পায়ে পুকুরের দিকে এগিয়ে গেল।

অনেকক্ষণ পর ফিরে এলো ।

ভেজা চুল পিঠ বেয়ে নেমে এসেছে। পরনে পরিষ্কার শাড়ি। মুখে এখনো গভীর বিষাদের ছাপ, কিন্তু ধুলো-মাখা ক্লান্ত অবয়বের জায়গায় যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি ফুটে উঠেছে।

আমি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে একবার দেখলাম। তারপর দূরে সরে দাঁড়িয়ে বললাম,

— “এবার এসো। এই ঘরে তোমাকে আশ্রয় দিচ্ছি করুণা করে নয়, একজন মানুষ হিসেবে সম্মান দিয়ে। বাইরে পৃথিবী তোমার নামে যত কলঙ্কই লিখুক, এই গৃহের ভেতরে তোমার পরিচয় শুধু একটাই—তুমি একজন মানুষ।”

তারপর মৃদু হেসে বললাম,
— “আজ থেকে তোমার নাম আগমনী।”
সে বিস্মিত চোখে আমার দিকে তাকাল।
— “আগমনী?”
— “হ্যাঁ। কারণ তুমি আমার জীবনে নতুন করে আসোনি, তুমি এসেছো আমার বহুদিনের মৃত নীরবতার ভেতর প্রথম জীবনের শব্দ হয়ে । তোমার আগমনে এই নিঃসঙ্গ গৃহের দরজা আবার একবার খুলেছে। তাই আজ থেকে তোমার নাম আগমনী।”
সে কিছু বলল না। শুধু চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ল।
আমি জানালার বাইরে তাকালাম।

ধীর কণ্ঠে বললাম,
— “এই গৃহের চারপাশে শুধু অন্ধকার নয়, আমার বিশ্বাস —সমগ্র পৃথিবীর রঙই বুঝি অন্ধকার। আলো বলে যা কিছু আছে, তা মানুষের কল্পনা মাত্র।

আগমনীকে ভাতের থালা সামনে নিয়ে নির্বাক বসে থাকতে দেখে আমার বহুদিনের ঘুমন্ত অতীতগুলো একে একে জেগে উঠল। তার চোখ থেকে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, অথচ মুখে এক মুঠো ভাত তোলার শক্তিটুকুও যেন অবশিষ্ট নেই।

আমি অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

ভাবতে লাগলাম—একটা হৃদয় ঠিক কতবার ভাঙলে মানুষ আহারের স্বাদ ভুলে যায়? কতবার বিশ্বাসের মৃত্যু ঘটলে ক্ষুধাও নিঃশব্দে মরে যায়? কতটা প্রতারিত হলে একজন মানুষ ঘুমের মধ্যেও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে? কতটা অপমান বুকে জমলে জীবনকেও আর আপন বলে মনে হয় না?

পৃথিবী মানুষের দেহের ভার বহন করতে পারে, কিন্তু একটি ভাঙা হৃদয়ের ভার বহন করার শক্তি তার নেই।

প্রথমবার উপলব্ধি করলাম—শুধু শরীরের মৃত্যুতে মানুষ মরে না কখনো কখনো মানুষ বেঁচে থাকতেই তার সমস্ত অনুভূতি, সমস্ত স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই নিঃশেষ হয়ে যায়। এমন এক মৃত্যু যার সংবাদ পৃথিবীর কোন প্রাণী জানে না।

আমি আজও ভীষণ অবাক হই, যখন গোটা একটা পুরুষ সমাজ একজন নারীকে চরিত্রহীনা বলে আখ্যায়িত করে।

নারীর চরিত্র একাই কীভাবে হরণ হয়? যদি কোনো অবৈধ স্পর্শ না ঘটে। যদি কোনো অবৈধ সম্পর্কের কারণে একজন নারী চরিত্রহীনা হয়, তবে সেই সম্পর্কের অপর প্রান্তে থাকা পুরুষটির পরিচয় কী?

পুরুষের গায়ে কি কখনো কলঙ্ক লাগে না?
সমাজ কি কোনো দিন তাকে কলঙ্কিত বলে চিহ্নিত করে?
বিচারের কাঠগড়ায় কেন শুধু নারীকেই দাঁড়াতে হয়?
বড় অদ্ভুত এই সমাজ! পাঠকগণ একবার ভাবুন। না আমি পুরুষ সমাজ কে দোষারোপ করছি না। আমি সমগ্র পুরুষ জাতির দিকে আঙুল তুলছি না।

তবে এখানে পুরুষের ভুলকে বলা হয় সাময়িক দুর্বলতা, আর নারীর নামে সারা জীবনের জন্য লিখে দেওয়া হয় চরিত্রহীনার তকমা কেন? তবে কি নারীরা ভুলের উর্ধ্বে?
নারী পুরুষ কেউই ভুলের উর্ধ্বে নয়, মানুষের সর্ব উত্তর পরিচয় ভুল। যদি তা অনিচ্ছা কৃত ভাবে ঘটে।

মাঝে মাঝে মনে হয়, কলঙ্কিনী হওয়ার সৌভাগ্য—অথবা দুর্ভাগ্য—এই সমাজ শুধু নারীকেই দিয়ে রেখেছে। পুরুষ সারাজীবন শুদ্ধতা নিয়েই বাঁচে।

আমি হেসে উঠলাম।

“হা… হা… হা…! কী অদ্ভুত এই সমাজের বিচার!”

যে পুরুষ একজন বারবণিতার দুয়ারে গিয়ে টাকার বিনিময়ে একটি নারীর শরীর কিনে নেয়, সমাজ তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। অথচ যে নারী পেটের দায়ে, অভাবের তাড়নায় কিংবা সমাজের নির্মমতার শিকার হয়ে নিজের শরীর বিক্রি করতে বাধ্য হয়, সমস্ত কলঙ্কের ভার তার কাঁধেই চাপিয়ে দেওয়া হয়।

পতিতা তার শরীর বিক্রি করে—কিন্তু সেই শরীর কিনতে কে যায়? তাকে কি বলে ডাকা উচিত?

যদি শরীর বিক্রি করা পাপ হয়, তবে সেই পাপ ক্রেতা কি পুণ্যবান?

আমার কাছে মনে হয়, পেটের ক্ষুধা নারীকে শরীর বিক্রি করতে বাধ্য করতে পারে; কিন্তু কামনার ক্ষুধায় নিজের বিবেক, সংযম আর মানবিকতাকে বিসর্জন দেওয়া আরও ভয়ঙ্কর পাপ।

সেদিন রাতে আগমনী জানালার দিকে মুখ করে ঘুমিয়ে ছিল। বাইরে পূর্ণিমার জ্যোৎস্না নেমেছে। জানালার ফাঁক গলে চাঁদের স্নিগ্ধ আলো এসে নীরবে তার মুখমণ্ডলের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছিল, আজ সমস্ত জ্যোৎস্না যেন তার মুখের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে নিঃশব্দে আশ্রয় নিয়েছে। পৃথিবীর সব ক্লান্তি, সব কান্না ছাপিয়েও তার মুখে এক অপার্থিব প্রশান্তির ছায়া ফুটে উঠেছিল।

আমি অনেকক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

হঠাৎ আমার চোখ পড়ল তার শরীরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ক্ষতচিহ্নগুলোর দিকে।

নীলচে দাগ, রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে যাওয়া ক্ষত, কোথাও নখের আঁচড়, কোথাও নির্মম আঘাতের চিহ্ন।

আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।

মানুষ কি সত্যিই আরেকজন মানুষকে এতটা নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করতে পারে?

কোনো হৃদয় কতটা পাষাণ হলে ভালোবাসার নামে এমন নিষ্ঠুরতা উপহার দিতে পারে?

আমি নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।

তার শরীরের ক্ষত হয়তো একদিন শুকিয়ে যাবে। সময় ধীরে ধীরে সেই দাগগুলোকে মলিন করে দেবে। কিন্তু যে ক্ষত তার হৃদয়ে রয়ে গেছে, যে বিশ্বাস ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়েছে, যে অপমান প্রতিদিন তাকে ভেতর থেকে হত্যা করছে—সেই ক্ষত সারিয়ে তোলার মতো কোনো ওষুধ আজও পৃথিবীতে জন্মায়নি।

শরীরের রক্তক্ষরণ একদিন থেমে যায়; কিন্তু হৃদয়ের রক্তক্ষরণ মানুষের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত নীরবে ঝরতেই থাকে।

আর যে নারী জেনেশুনে অন্য এক নারীর সংসার ভেঙে নিজের ভালোবাসার প্রাসাদ গড়তে চায়, আমার কাছে সে নারীত্বের মর্যাদা ধারণ করে না। সে সংসার খেকো রাক্ষস স্বরুপ।

সংসার ভেঙে যে সুখের ভিত্তি রচিত হয়, তার ইটের ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে থাকে অন্য কারও অশ্রু, অন্য কারও দীর্ঘশ্বাস, অন্য কারও অভিশাপ।

অন্যের চোখের জল দিয়ে কোনো দিন নিজের সুখের ঘর নির্মাণ করা যায় না।
আমার বিশ্বাস, যে মানুষ অন্যের সংসার ভেঙে নিজের স্বপ্ন সাজায়, সে ভালোবাসার নয়—স্বার্থের পূজারি।

সেদিনের পর বহু বছর কেটে গেছে।
আগমনী আর কোনো দিন তার অতীতের কথা জানতে চায়নি। সে যেন আমার ছায়ার মতো গড়ে উঠেছে তার সামনে দাঁড়ালে আমার আর কখনো আয়না লাগেনি, আমি তার মধ্যে আমাকে খুঁজে পেয়েছি।

আজও মাঝে মাঝে গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায়।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখি, সেই পুরোনো বটগাছটি এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কাকেরা এখনো ভোর হলে ডেকে ওঠে। পৃথিবীও আগের মতোই চলছে।
শুধু বদলায়নি কিছু মানুষ রূপ ধারণ করা অমানুষের বিচার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন