একবিংশ শতাব্দীর এই মধ্যগগনে এসে পৃথিবী যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ গবেষণা আর আধুনিক প্রযুক্তির চরম শিখরে আরোহণ করছে, তখন আমরা যেন নিজেদের পেছনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছি। বাহ্যিকভাবে আমাদের চারপাশের দালানকোঠা বেড়েছে, মেগা প্রজেক্ট হয়েছে, যোগাযোগের গতি বেড়েছে—কিন্তু মননশীলতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং চিন্তাধারা পর্যালোচনা করলে প্রশ্ন জাগে: আমরা কি সত্যিই সামনের দিকে হাঁটছি, নাকি মানসিকতার বিচারে এক শত বছর পিছিয়ে পড়ছি? সমাজ, পরিবার এবং শিক্ষাব্যবস্থা—এই তিনটি মৌলিক স্তম্ভের করুণ দশা পর্যালোচনা করলে এই পিছিয়ে পড়ার বাস্তব রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রথমেই আসে আমাদের পারিবারিক কাঠামোর কথা। পরিবারকে বলা হতো নৈতিকতার প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং শান্তির আশ্রয়স্থল। অথচ আজকের পরিবারব্যবস্থা যেন ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা আর প্রদর্শনেচ্ছার (show-off) দাস হয়ে পড়েছে। এক শত বছর আগে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও যৌথ পরিবারের যে পারস্পরিক সহানুভূতি, শ্রদ্ধা এবং যৌথ দায়বদ্ধতার চর্চা ছিল, তা আজ বিলুপ্তপ্রায়। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে একক পরিবার হওয়াও সমস্যা ছিল না, কিন্তু বন্ধনগুলো ভেঙে আজ সবাই একই ছাদের নিচে বাস করেও যেন এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। সামাজিক মাধ্যম ও স্ক্রিন-অ্যাডিকশনের যুগে মা-বাবা এবং সন্তানের মধ্যকার আত্মিক যোগাযোগ শূন্যের কোঠায়। সন্তানকে একটি জিপিএ-৫ পাওয়ার যন্ত্র বানানোর প্রতিযোগিতায় মা-বাবারা নামছেন; কিন্তু তার ভেতরের সহানুভূতিশীল ও সুনাগরিক হয়ে ওঠার গুণগুলো লালন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
পারিবারিক ভঙ্গুরতার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে সমাজে। আমাদের সমাজব্যবস্থা দিন দিন আরও বেশি অসহিষ্ণু, হিংসুটে ও পশ্চাৎপদ মানসিকতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। প্রযুক্তির আলো আমাদের হাতের মুঠোয় এলেও চিন্তাভাবনার কুসংস্কার ও অন্ধত্ব কাটেনি। সামাজিকভাবে মুক্তচিন্তা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং নারীদের নিরাপত্তা ও সম্মানের বিষয়টি এক শত বছর আগের অন্ধকারের মতোই সংকীর্ণ। আজ তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা ব্যবহার করে গুজব ছড়ানো, সাইবার বুলিং এবং কুৎসিত ঘৃণা ছড়ানোর উৎসব চলে। ভিন্ন মতকে সহ্য করার মানসিকতা সমাজ থেকে প্রায় মুছে গেছে। যে সমাজে প্রতিবেশীর বিপদে এগিয়ে আসার চেয়ে স্মার্টফোনে ভিডিও তৈরি করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সেই সমাজকে কোনো যুক্তিতেই ‘আধুনিক’ বা ‘এগিয়ে যাওয়া’ সমাজ বলা চলে না।
সবচেয়ে ভয়াবহ অবক্ষয় ঘটেছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়। শিক্ষা হওয়া উচিত ছিল মেধার বিকাশ, প্রশ্ন করার মানসিকতা তৈরি এবং চরিত্র গঠনের মাধ্যম। কিন্তু আমাদের শিক্ষা আজ কেবল সনদ অর্জনের বাণিজ্যিক কারখানায় পরিণত হয়েছে। শতবর্ষ পূর্বে এই বাংলাতেই খুব সীমিত সম্পদে বিশ্বমানের গবেষক, চিন্তাবিদ এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারী তৈরি হতো। আর আজ অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয় ও আধুনিক অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও আমরা উদ্ভাবনী গবেষণায় শূন্য। মুখস্থবিদ্যা, জিপিএ-৫-এর মোহ এবং ঘন ঘন শিক্ষানীতির অপরিকল্পিত পরিবর্তনের চাপে পিষ্ট হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। নীতি-নৈতিকতা ও জীবনমুখী শিক্ষার অভাবে উচ্চশিক্ষিত হয়েও সমাজ পাচ্ছে দুর্নীতিবাজ, নীতিহীন কর্মকর্তা আর আত্মকেন্দ্রিক নাগরিক।
উন্নয়ন মানে কেবল ইট-পাথরের কঙ্কাল দাঁড় করানো নয়; প্রকৃত উন্নয়ন ঘটে মানুষের চিন্তা ও মননে। আমরা যদি পরিবারে মমত্ববোধ ফিরিয়ে আনতে না পারি, সমাজে সহনশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে না পারি এবং শিক্ষায় সনদনির্ভরতার বদলে জ্ঞান ও নৈতিকতার আলো জ্বালাতে না পারি—তবে তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বাস করেও আমরা বস্তুত এক শত বছর আগের অন্ধকারেই রয়ে যাব। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের মননশীলতার আধুনিকায়ন এখনই প্রয়োজন, নতুবা ভবিষ্যতের ইতিহাস আমাদের এক হারিয়ে যাওয়া প্রজন্ম হিসেবেই চিহ্নিত করবে।
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন