বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। তবে যোগাযোগের এই আধুনিক মাধ্যমটি এখন আর কেবল তথ্য আদান-প্রদান বা সুস্থ বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অতিমাত্রায় ‘ভিউ’ পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভ পুরো সমাজকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের নামে প্রতিদিন যে অশালীন, রুচিহীন ও বিকৃত ভাষার চর্চা ফেসবুকে চলছে, তা দেশের শিক্ষার মান ও হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী বাঙালি সংস্কৃতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ফেসবুককেন্দ্রিক এই অপসংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে আমাদের তরুণ প্রজন্ম ও কোমলমতি শিশুরা। সমাজে এখন বই পড়া বা প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের চেয়ে ফেসবুকে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার প্রতিযোগিতা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। একজন শিক্ষার্থী যখন দেখে যে বছরের পর বছর পরিশ্রম করে পড়াশোনা ও ডিগ্রি অর্জন করেও সঠিক মূল্যায়ন পাওয়া যাচ্ছে না; অথচ কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই স্রেফ অশালীন আচরণ, বিকৃত অঙ্গভঙ্গি কিংবা কুরুচিপূর্ণ কথা বলে ফেসবুকে বিপুল অর্থ ও ডলার আয় করা যাচ্ছে—তখন শিক্ষার প্রতি তার আগ্রহ হারিয়ে ফেলাটাই স্বাভাবিক। এর ফলে দেশের সার্বিক শিক্ষার মান দিন দিন তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। নৈতিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার স্থান দখল করে নিচ্ছে ভিউসর্বস্ব ভার্চুয়াল পরিচিতি।
শুধু শিক্ষাই নয়, বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী শালীনতা ও মার্জিত আদব-কায়দা আজ বিলুপ্তির মুখে। পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে গ্রামের আনাচে-কানাচে, শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ—সব স্তরের মানুষের মুখে মুখে এখন ফেসবুক থেকে শেখা অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ ভাষার ব্যবহার। অনেক কন্টেন্ট ক্রিয়েটর নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে সমাজের ন্যূনতম মূল্যবোধকেও জলাঞ্জলি দিচ্ছে। এমনকি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্ব বা সমাজের গুণীজনদের নিয়েও মনগড়া ও অশ্রাব্য ভাষায় কন্টেন্ট তৈরি করতে তারা কুণ্ঠাবোধ করছে না। বিশ্বজুড়ে উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি নিয়মনীতি মানা হয়, আমাদের দেশে তা প্রায় অনুপস্থিত। উন্নত বিশ্বে সোশ্যাল মিডিয়া কেবল যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়; তা মেধা ও শিক্ষার বিকল্প বা সস্তা উপার্জনের প্রধান হাতিয়ার নয়।
এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের সামাজিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে। মেধা ও নৈতিকতার ওপর জয়ী হবে অপসংস্কৃতি ও সস্তা বিনোদন। সমাজ যখন জ্ঞান ও মেধার চেয়ে বিকৃতিকে পুরস্কৃত করে, তখন সেই সমাজের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হতে বাধ্য।
এই সামাজিক অবক্ষয় থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। ফেসবুকে মনিটাইজেশন বা কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের মাধ্যমে আয়ের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা ও নীতিমালার মানদণ্ড নির্ধারণ করা যেতে পারে। অন্ততপক্ষে একটি সুনির্দিষ্ট অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা ও সাইবার-নীতিমালার পরীক্ষার মাধ্যমে কন্টেন্ট অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হলে সমাজে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। একই সাথে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কুরুচিপূর্ণ ভাষা, বুলিং ও অশ্লীলতার বিরুদ্ধে শূন্য-সহনশীলতা নীতি (Zero Tolerance) গ্রহণ করতে হবে। বিকৃত কন্টেন্ট বর্জন এবং সুস্থ মানসিকতার চর্চা নিশ্চিত করতে না পারলে, এই ভার্চুয়াল মাধ্যমটি আমাদের আগামী প্রজন্মকে এক বিবেকহীন ও মেরুদণ্ডহীন সত্তায় পরিণত করবে।
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন