• রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০২ পূর্বাহ্ন
শিরোনামঃ
কালীগঞ্জে ১২ বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও গর্ভপাতের অভিযোগ, আটক ৩ মাদক বিরোধী অভিযানে মাদক কারবারি আটক করে থানায় আসার সময় এস আই সহ নিহত ২ আহত ২ জন মোঃ মুক্তাদির হোসেন, বাংলাদেশ কবিতা সংসদের সাহিত্য সম্মেলন প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত কবিতা: সমাজের আয়না সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়েই আমরা এ সমাজে বসবাস করি: ফজলুল হক মিলন এমপি দুর্গাপূজার মণ্ডপে মণ্ডপে এমপি মিলন, দিলেন পাশে থাকার আশ্বাস তুমুলিয়া ইউনিয়নের ইতিহাসে প্রথম নারী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শিখা বেগম কবিতা:মায়ার পৃথিবী, সত্যের স্রষ্টা — একটি আত্মোপলব্ধির কবিতা রচনায়: মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম তারিখ:১৬/১০/২০২৬ স্বী স্ত্রীর রমীমা মাদক ব্যবসা কালীগঞ্জে ১ কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তার ১, কালীগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ীদের উদ্যেগে ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত

গল্পঃ অস্তিত্ব, লেখিকাঃ রিমা বিশ্বাস, দৈনিক বাংলার কথা

বাংলার কথা ডেস্ক / ৬১ বার পঠিত
আপডেটঃ বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

গল্পঃ অস্তিত্ব
লেখিকাঃ রিমা বিশ্বাস

এ বাড়ির টুথপেষ্ট পর্যন্ত অনেক দামের।বাথরুম যে এমন হয় তাও ধারণার বাইরে।বডি ওয়াশের
ভ্যারাইটি দেখলে চোখ ধাঁধিয়ে যায়।অ্যাডভোকেট অয়ন রায় তো জ্যাজ চালিয়ে বাথরুমে ঢোকেন।বাথরুমের ভিতর সাউন্ড বক্স ফিট করা।থ্রি-ডি ওয়ালের টাইলস গুলোয় দূরন্ত ডলফিনের লাফঝাপ!
মৃত্যঞ্জয় শুধু দেখে।ভাবে আর উপলব্ধি করার চেষ্টা করে। মানুষের ভাগ্য বুঝি এমন চমৎকার ভাবে বদলে যায়?
হ্যাঁ জীবনকে বদলাতে দেখেছে এই বিশ বছরের তারুণ্যে ভরপুর জীবনে কিন্তু তা সুখকর পরিবর্তন নয়।সে পরিবর্তন অসুবিধার। জটিলতার কখনো মন ভেঙে দেওয়ার। এ বাড়ির সামনে লম্বা লন।লন পেরিয়ে বিশাল বাগান।সবুজ ঘাস গোলাপ বাগানবিলাস আরও অনেক কেয়ারিকরা ফুলগাছ। অত গাছের নামও জানা নেই ।বাগানের কোন বরাবর আছে সারভেন্ট কোয়ার্টার।যেখানে পাশাপাশি থাকে এদের মালি আর কেয়ারটেকার। এখনো অবশ্য এ বাড়ি আমার এ কথা ভাবতে কেমন যেন বাঁধে!
সামনের উঁচু আতা গাছটার ছায়া তলে বসে বসে খেলছে এ বাড়ির মালির মেয়ে ঝুম্পা আর কেয়ারটেকারের ছেলে সরজু।সেদিকেই চোখ যায় বারবার।
এই এত ঐশ্বর্য সফিসটিকেশন বা খ্যাতি নয় এই বাচ্চা গুলো যেন মনে করিয়ে দেয় কত কথা।এদের দলেই তো ছিল কয়েক মাস আগে।মাত্র ছয় মাস।এ ছয় মাসের কেমন ভাবে বদলে গেল মৃত্যুঞ্জয়ের পৃথিবী।
এর আগে কে ছিল সে?
বাগদিপুরের এঁদো গলির ভাড়া বড়িতে থাকা এক সাধারণ কর্মচারীর ছেলে।যার বাপ কোন এক বেসরকারি আপিসের কম্পিউটারে হিসেব তোলে।কখনো সাহেবের সঙ্গে তার তদারক হয়ে আপিসের কাজে ট্যুরে বের হয়।স্যাঁতসেঁতে খুপরি ঘর।দেওয়ালে নোনা ধরা।দেওয়াল জোড়া দেবদেবীর ফোটো।মেঝের সিমেন্ট ওঠা বাথরুমের শ্যাওলা।যতই পরিষ্কার কর নালি দিয়ে জল ঠিকমত যায় না তাই জমা জলে শ্যাওলা ধরে। এর ওপর বর্ষায় কেঁচো কেন্নোর উপদ্রব। ঘরে ছোটাছুটি করে ধাড়ি ইঁদুর।নাকে মাঝে মাঝে আসে ছুঁচোর গন্ধ।রান্না ঘরে পুরনো কৌটয় রাখা চানাচুরের ঢাকা খুললে আসে আরশোলার লাদির বোটকা গন্ধ।এভাবেই চলছিল তো বেশ।এভাবেই ভাড়া বাড়ি ঘুরে কখনো মিউনিসিপালিটির কখনো সরকারি স্কুলের পড়া চালিয়ে মৃত্যুঞ্জয় অঙ্কে অনার্স নিয়ে ভর্তি হল সরকারি কলেজে।ভালো ছিল।মানুষ যতক্ষণ চোখ বুজে থাকে ততক্ষণ ভালোই থাকে অসুবিধা হয় চোখ খুলে গেলে!
আর এ কি ভীষণ চোখ খোলা!
বলা যায় মাথার পিছনে আঘাত!
মাত্র ছয় মাস হল এর ভিতর মৃত্যুঞ্জয়ের বিশ বছরের জীবনের সত্যটা মিথ্যে হয়ে গেল।
মায়ের সঙ্গে গেছে বাজারে। হাতে থলি।সন্ধ্যা তখন বেগুন হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছেন তা কানা কি না।
আর তখনই একটা বিশ্রী দেখতে লোক।পেট মোটা চোখের তল ফোলা।চুল ওঠা। ঠোঁটের কোণের ক্ষতওয়ালা একটা লোক।লোকটা সন্ধ্যাকে, মৃত্যঞ্জয়ের পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সের মা’কে কি নামে ডাকল?আর কি জিজ্ঞেস করল?
লোকটা জিজ্ঞেস করল…..”গুলাবো তুই? শালি ধান্দা ছাড়লি যে?দিন চলে? “
সন্ধ্যা লোকটাকে দেখে যেন কেঁপে উঠল। যেমন ভয় পায় পাঠা কসাইকে দেখে।তারপর আর কোনো কথা না বলে হাতের বেগুন ওখানেই রেখে মৃত্যুঞ্জয়কে বলল….”চল!”
এ কি স্বাভাবিক কিছু?
মা’কে অজস্রবার প্রশ্ন করে গেছে এ বিষয়ে।
….”মা লোকটাকে চড়ালে না কেন?”
….”কে ছিল?ওকে ভয় পাওয়ার কি কারণ? “
কিন্তু সন্ধ্যা প্রায় ওর সব প্রশ্ন অগ্রাহ্য করে কখনো হাঁড়ি মাজছে তো কখনো গ্যসের আভেনে কড়া চাপাচ্ছে।অকারণে রান্না ঘরের কৌট গুলোর প্যাঁচ কষছে আর ন্যাতা দিয়ে সেগুলো মুছছে!
এগুলো ঠিক ছিল না।একটা সময় না পাওয়া উত্তরে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে দেখতে লাগল মায়ের চোখমুখ।ভদ্রমহিলার চোখমুখ অন্যরকম।শ্যামলা মুখটা ফ্যাকাসে। চোখ দুটো অস্বাভাবিক।
শান্ত ধীর গলায় মৃত্যুঞ্জয় জিজ্ঞেস করল….”কি হয়েছে? “
মা উত্তর দিল না কড়াতে ছ্যাং ছ্যুং শব্দে যখন ফোড়ন দিল তখন চেঁচিয়ে উঠল মৃত্যুঞ্জয়….. “সত্যিটা বলবে?”
বাইরে বেল বাজছে।ছুটির দিন তাই বাবা গিয়েছিল আরেকটা বাড়ির খোঁজে এ বাড়িটা বড়োই অস্বাস্থ্যকর। এখানে থাকা যায় না তাই।
অন্য সময় মা চেঁচিয়ে বলে… “বুবাই দরজাটা খোল…”
কিন্তু আজ সে ছুট্টে গেল নিজেই দরজা খুলতে।
মৃত্যুঞ্জয়ের কেরানি বাপ প্রতাপ বক্সী প্লাস্টিকে ভরা পেয়ারার থলে এগিয়ে দিল হাসি মুখে কিন্তু সন্ধ্যা তখনই হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
দরজাটা তাড়াতাড়ি দিয়ে প্রতাপ কোনও রকমে সামলালেন স্ত্রীকে।
সন্ধ্যা ভেঙে পড়েছে। কান্নার দমক সামলে ফুঁপিয়ে কোনো রকমে বলল…”আজ আমার সব্বনাশ হল গো সব্বনাশ!”
…”কি হয়েছে? “প্রতাপও সঙ্কিত।
সন্ধ্যা বলল….”আজ বাজারে লাছমান শেঠজির সঙ্গে দেখা হয়েছিল!”
রান্না খাওয়া স্নান আর কিছুই হল না সেদিন। অন্য দিন ছুটির বার হলে মা মুরগী রাঁধে।আজ বাজার থেকে নিয়ে এসেছিল পাবদা তাই বেগুন দিয়ে ঝোল করার কথা ছিল।স্নান সেরে তিন জনে খেতে বসে রান্নাঘরের সামনেটায়।তারপর ভাত খেয়ে একটা ঘুম কখনো টিভিতে প্রতাপ দেখেন মারদাঙ্গার হিন্দি বই।সন্ধ্যাও দেখে। মৃত্যুঞ্জয় তখন ফেসবুক ঘাঁটে।গল্প পড়ে ফেসবুক রাইটারদের।আর আজ রান্নাঘর পড়ে রইল।বেগুন আনা হয়নি।মাছগুলো ভাজা পড়ে আছে।কড়ার ঝোল ফুটতে ফুটতে শুকিয়ে গেছে।
সন্ধ্যা প্রতাপের বুক আঁকড়ে মেঝেয় পড়ে।প্রতাপ অসহায় ভাবে স্ত্রীকে আগলে বসে।
মৃত্যুঞ্জয়ের মাথায় একটা আবছা সমীকরণ তখনও ফর্মুলায় আসেনি।
বিকেলে প্রতাপ ওকে নিয়ে বেরল বাইরে।রাস্তা একটানা নিম্নচাপের দৌরাত্ম্যে প্যাঁচপ্যাঁচে।জোলো হাওয়ার দোসর গুমোট গরম।রেক্সিন খাটানো ঠেলাগাড়ির উপর কাঁচের শোকেসে রাখা আলুর চপ বেগুনি। গরম কড়ার তেলে ছাড়া হয়েছে ফুলুরি।
একটা ঠোঙায় প্রতাপ বেগুনি আর আলুর চপ নিলেন।
….”দুপুরে কিছু খাসনি।দুটো মুখে দে!”বললেন।
খিদে পেয়েছিল। সারা দিনের না খাওয়া খিদে তো পাবেই।তাই বিটনুনের গন্ধ স্বাদে মাখা চপ গুলো দু কামড়েই শেষ করে ফেলল।
প্রতাপ বললেন…. “যা তোকে কখনো বলার প্রয়োজন পড়বে বলে ভাবিনি তা আজ বলতে হচ্ছে!ভেবেছিলাম অতীত কখনো সামনে এসে দাঁড়ায় না।কিন্তু আপসোস… “দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন প্রতাপ।
বলেন…..”এখন ভাবি আমি হুট করে মরে গেলে তারপর যদি তুই সবটা জেনে ওকে গ্রহণ না করিস?তবে সে কোথায় যাবে?”
তখন গলার কাছে সব খাবার গুলো ঠেলা দিচ্ছে।ও যা ভাবছিল তাই কি ঠিক?
হ্যাঁ তাই।প্রতাপ যা জানালেন তাতে সন্ধ্যা যার বাপ মা কেউ ছিল না এমনটাই জেনে এসেছিল মৃত্যুঞ্জয়। যার জন্য ওর মামাবাড়ির কোনো অস্তিত্ব ছিল না।আর আজ জানল ওর মাকে খুব ছোট বয়সে ওর গ্রামের এক যুবক পতিতা পল্লীতে বেচে দিয়েছিল।সে দেহ ব্যবসায় নামতে বাধ্য হয়।প্রতাপ ছিলেন নিম্নমধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে।বাপ মা হারা পিসি পিসেমশায়ের কাছে মানুষ। বন্ধুদের সঙ্গে একবার অ্যাডভেঞ্চার শখে এসে হাজির হয়েছিল সেখানে। আর সেখানে শ্যামলা জড়োসড়ো মেয়েটাকে দেখে বড়ো মায়া হয়েছিল।মায়ের গয়না পিসির আলমারি থেকে না বলে বের করে এনে দিয়েছিল সন্ধ্যার মনিবানাকে।সে ওই গয়নার বিনিময়ে ছেড়ে দিয়েছিল সন্ধ্যাকে।সে সময় ওর নাম ছিল গুলাবো।প্রতাপ ওর নাম দেয় সন্ধ্যা!
মৃত্যুঞ্জয়ের সারা শরীর ঘেন্নায় পাক দিয়ে উঠেছিল।এই কি ছিল জীবনের অতলান্তে?
শেষে এই পরিচয় বয়ে বেরাতে হবে?বেশ্যার ছেলে?
এ যে গালি!কি ভাবে বাঁচবে ও?
সকাল বিকেল রাত্রে যখন এ প্রশ্নের দুর্বিষহ জ্বালায় জর্জরিত। যখন কিছুতে মেনে নিতে পারছে না নিজের শরীরে বইতে থাকা রক্তের কালিমা!বারবার নিজের অস্তিত্বের ওপর উঠে আসছে প্রশ্ন চিহ্ন। ঘেন্না করছে এই যুগলকে যারা ভাগ্যের কুচক্রে ওর বাবা মা তখন কারাগারের নিশছিদ্র অন্ধকারের ভিতর কোন এক বেনামি ফাঁটল দিয়ে দেখা গেল আলোর তীক্ষ্ণ উৎস।
চার দিন না খেয়ে থেকে শরীর যখন বিছানায় প্রায় লেগে গেছে তখন শীতল হাতের স্পর্শে চোখ ফিরিয়ে দেখে সন্ধ্যা তার করুন চোখে ওর দিকে চেয়ে।ঘেন্নায় আর রাগে মাথার তালু প্রায় ফেটে যায় তখন। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হয়।একটা পচা গলা হাত ওকে ছুচ্ছে কেন?
এই মহিলা এক পচা ভাদ্রে লেকচার দিয়েছিল ওকে।বলেছিল….”বুবাই বড়ো হচ্ছিস মোবাইলে কি দেখবি না দেখবি আমি বলে দেবো না কিন্তু পতিত হোসনি বাপ।মেয়েদের সঙ্গে প্রেম কর ক্ষতি নেই কিন্তু ভোগ্য বস্তু হিসেবে দেখিস না। ওতে স্খলন হয়!অনেক মা মনে করে ছেলে তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি আর সে সম্পত্তিতে আর কেউ ভাগ বসাতে পারবে না।ছেলের রোজগারে থাকবে শুধু তার অধিকার এখানে অন্য কোনো মেয়ে নিদেন পক্ষে যদি প্রেমিকাও আসে তবে সে সইতে পারবে না।ছেলে যদি স্ত্রী বা প্রেমিকার পিছনে নুন্যতম টাকাও খরচ করে তখন বুকে জ্বালা ধরে যায় মায়েদের!অথচ মেয়েরা যদি তার ছেলের পিছনে টাকা খরচ করে তখন ভাববে আমার ছেলেটাকে বাগিয়ে নেওয়ার ফন্দি করছে। কারণ ওই ছেলে ভিন্ন মেয়েটির আর বিয়েই হবে না!আমি অমন মা নই।বুবাই তুই একজন আদর্শবান পুরুষ হওয়ার চেষ্টা করিস।সমাজে পুরুষের বড়ো অভাব!”
এই সব কথা কি মানায় এদের মুখে?
সন্ধ্যা অবশ্য অন্য কথাই বলল।বলল….”আমি নই রে বুবাই।তোর মা নই আমি।অনেক পাপকাজ করেছি কি না তাই ভগবান এমন অসমত্ত করল।বিয়ের পর তোর বাবা ডাক্তার দেখালে সে বললে কি একটা টিউব থাকে ওটা নাকি বন্ধ।আমাদের না ছিল টাকা না ছিল যুগ তখন অত এগিয়ে। সব বড়ো বড়ো জায়গার ব্যাপার। বাঁজ হয়েই চলছিলুম কিন্তু আমার পরিচিত সুলেখাদি।শাবনম বারে নাচত তখন ওর কোলে দেখলাম লাল লাল চুল ফরসা নাদুসনুদুস একটা বাচ্ছা।ওকে জিজ্ঞেস করলুম কার ছা গো?ও বললে ভিখারি করব একে।সিগন্যালে বসাব।আমি ওর হাতে পায়ে ধরে হাজার দশেক টাকা তোর বাপ এর ওর থেকে ধার করে সুলেখাদিকে দিয়ে তোকে নিয়ে নিই।তুই আমার রক্তের না রে ছোরা।তোর বাপ মা অন্য কেউ হবে!”
রাগে আক্রোশে সন্ধ্যার দু হাতে ধরে মৃত্যুঞ্জয় তখন ঝেঁঝে ওঠে…..”ধান্দাওয়ালি! সব ফালতু মেয়েছেলের দল বল!বলি আমার আসল বাপ মা কে?নইলে থানায় তোদের নামে এফ.আই.আর করব!””
সে সময় প্রতাপ তার বলীষ্ঠ হাতে এক চড় বসায় গালে…”চোপ!আর একটা কথা বললে ঘাড় ধরে এ বাড়ি থেকে বিদেয় করে দেব!আজ এই ধান্দাওয়ালি না থাকলে সিগন্যালে ভিক্ষা করে খেতিস এক চোখ অন্ধ বা ল্যাংড়া খোঁড়া হয়ে।তবু যদি নিজের পরিচয় জানার এত শখ হয় তবে দুটো দিন সময় দে!সুলেখা যদি বেঁচে থাকে তবে ওর খোঁজ আমি পাবই।“
খোঁজ পাওয়া গেল সুলেখার।মেথর পল্লীর ঘুপচি গলির ভিতর ভাঙা কাঠের সিঁড়ি নিয়ে যায় দোতলার লম্বা করিডরে। পাল্লার কবজা ভাঙা দরজা ছেঁড়া কাপড় টানানো পর্দা।একটা বেড়াল লেজ ফুলিয়ে বেরিয়ে এসে দরজায় পেচ্ছাপ করে গেল।
এক শীর্ণ বুড়ি।সাদা চুলের খোপা মাথার উপর।ফরসা অ্যানিমিক চেহারা বাতে মেরুদণ্ড বেঁকে গেলেও চোখের জ্যোতি আর গলার স্বর এখনো তীব্র।প্রতাপ আর মৃত্যুঞ্জয়কে দেখে বলল….”না খেতে পেয়ে এমন বুড়ি হয়েছি নইলে বয়স বেশি হয়নি কো!সাতান্ন হবে এ বচ্চর!বাতে ধরল তারপর পড়েছি অনেক বার।চুল গুলোয় আর কলপ হয় না!”
মৃত্যুঞ্জয় আকুতি করে ওঠে….”মাসি তুমি আমার মা বাপের ঠিকানা বল।আমি তোমার বাতের চিকিৎসা করাব!খেতে দেব!”
সে তার কোঁচকান ত্বকে হাসে…..”বেইমানের ছেলে বেইমান।প্রতাপদা পারলে কাকের ছাকে পালতে?কেমন কুহু কুহু শুরু করল দেকো!কেন রে এদ্দিন যার খেলি পরলি তাদের সঙ্গে থাকা যাচ্ছে না?”
সুলেখার পায়ে পড়ল মৃত্যুঞ্জয়…. “মাসি আমি তোমার চির ঋণী থাকব।একবার ওদের পরিচয় দাও প্লিজ…”
সে বলল….”গুলাবো বড়ো ভালো মেয়ে ছিল। ওর কথা ভেবে তোকে খালি হাতে ফেরাব না!শ্যামলি উকিলের ছেলে তুই।ও আমার জোয়ান ছেলেটাকে খুনের দায়ে ফাঁসাল তাই বদলা নিতে ওর চাকরকে টাকা দিয়ে তোকে তুলে নিয়ে ছিলাম।ভেবেছিলাম তোকে ভিখিরি বানিয়ে শোধ তুলব কিন্তু গুলাবো এমন কেঁদে পড়ল যে ওকে দিতে বাধ্য হলাম…”
শয়তান পিশাচটার মুখে থুতু ছেটাতে ইচ্ছে করছিল তখনই কিন্তু ততক্ষণে চিত্ত বিচলিত হতে শুরু করেছে।দুপদাপ পায়ে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে নেমে প্রায় উন্মাদের মতন এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে একটা সময় বিভ্রান্ত হয়ে ভাবে এই অ্যাডভোকেট শ্যামলী রায় কি করে বিশ্বাস করবে মৃত্যুঞ্জয় বক্সী তার গর্ভজাত সন্তান?
কিন্তু তা বলে কি হাতের ওপর হাত রেখে দিন পার করা সম্ভব?
কলেজের বন্ধুদের মধ্যে কয়েকজন খুবই কাছের তাদের সবটা বললে, তরুণ বলল….”তোর মা’কে যে ভাষায় গাল দিচ্ছিস ওটা ঠিক নয়।বেশ্যা আবার কি? তাদের যৌন কর্মী বলে। অনেক অসহায় অবস্থায় পড়ে এই পেশায় আসে তারা।আর সে তো তোকে কিডন্যাপ করেনি।“
শ্রীতমা বলল…”আর এই শ্যামলী ম্যাডাম যদি ফালতু তোর ওপরই কেস করে দেয়?অনেক পাওয়ারফুল লোক হয় এরা!”
কিন্তু এ সব শুনে কি সত্যি চুপ করে থাকা যায়?নিজের সত্ত্বা নিজের লোকেদের থেকে দূরত্ব তৈরি করা যায়?
তেষ্টায় যখন বুক ফেটে যায় তখন কুয়োর সামনে দাঁড়িয়ে থেকে শুধু কি জলের ওপর নিজের প্রতিফলন দেখে তৃপ্ত হওয়া যায়?
তাই প্রবল টানে এক অদ্ভুত আকর্ষণে একটা চিরকুট রিসেপশন থেকে কেটে শ্যামলী রায়ের বিরাট বিলাসবহুল চেম্বারে প্রায় দেড় ঘন্টা বসে রইল সে।
বুকে অসম্ভব টানাপোড়েন। কখনও আনন্দের হিল্লোল।কখনো হতাশার কালোছায়া।কখনো দুকপুকে অজানা ভয়ের কালো গ্রাস।
রিসেপশনিস্ট মেয়েটি নাম ডাকল।
মৃত্যুঞ্জয়ের পায়ে কমদামি কাপড়ের জুতো বর্ষায় তা ভিজে সপসপে। গায়ে কটন ব্লেন্ডের মোটা চেক শার্ট।চুলে একবার হাত বুলিয়ে তা সেট করে চেম্বারে ঢোকে মৃত্যুঞ্জয়।
সাদা চেয়ারে ছড়িয়ে বসে যেন স্বয়ং বিচারদেবী।কি অপরূপ সৌন্দর্য। গায়ের রঙ যেন সোনা।চোখ দিয়ে ঠিকরে বেরচ্ছে জ্যোতি।মুখময় অভয় আভা।
ছুটে গিয়ে এই দেবীর পায়ে লুটিয়ে পড়তে মন চাইল।এ ওর মা?
এত উচ্চশিক্ষিত?মার্জিত?এত খ্যাতিমান আইনজীবী? যার সাক্ষাতের জন্য সারিসারি লোক অপেক্ষায়?
অ্যাডভোকেট শ্যামলী ভুরু নাচিয়ে প্রশ্ন করলেন…”বলুন!”
মৃত্যুঞ্জয়ের জিভ সরছিল না।
উনি সামনের ফাইল খুলে তাতে মন দিয়েছেন।মিনিট দুয়েকের ভিতর আবার তাকালেন।বললেন…. “বসুন!”
মৃত্যুঞ্জয় সামনের চেয়ার টেনে বসল।গলা ঝেড়ে নিয়ে বলল….”আপনি উকিল। অবশ্য শুধু উকিল বলে নয় কেউই মানতে চাইবে না যা আমি এখন বলব!”
শ্যামলী ভুরু কুঁচকে তাকালেন।
মৃত্যুঞ্জয় বলল…..”এক বিয়ার বারের ডান্সার আমায় কিডন্যাপ করে যখন আমার বয়স এক।“
মুহূর্তে জ্বলে ওঠে শ্যামলীর মুখ।
….”বান্সী তিওয়ারী ছিল আমার দেখভাল করার… বিশেষত বিকেলে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার লোক।বিয়ার বারের ডান্সার তার ছেলের ওপর অন্যায় হয়েছে ভেবে এক উকিলের ছেলেকে কিডন্যাপ করে ওই চাকর মারফত। বান্সী তিওয়ারি নামক চাকরকে দশ হাজার টাকা দিয়ে ঘটায় পুরো ব্যাপারটা। এ ঘটনা কি ফিল্মের স্ক্রিপ্টের মত শোনাচ্ছে?”
মৃত্যুঞ্জয় খেয়াল করে ততক্ষণে শ্যামলী সামনের ফাইলের কাগজ গুলো প্রায় খামচে ধরেছে।সে উদ্বেগে টেবিলের ওপর ঝুঁকে।ফরসা মুখটা লাল টকটকে!
কাঁপা গলায় মৃত্যুঞ্জয় বলে….”আপনি তো উকিল। খুব কি কঠিন হবে আপনার পক্ষে একটা ডি.এন.এ টেস্টের পারমিশন বের করা?”
আর তারপরই পুরো বদলে গেল মৃত্যুঞ্জয়ের জীবন। পাশা খেলার মতন হারতে হারতে হুট করে কি করে যেন পেয়ে গেল সাম্রাজ্য।

…”স্যার আপনার মাপ!”পিছন ফিরে দেখে সাদা পায়জামা পাঞ্জাবিতে দাঁড়িয়ে এক ভদ্রলোক।
মৃত্যুঞ্জয় একে চিনল না।কিছুটা অবাক হয়েই তাকাল।
সে বলল….”আমি, ‘ইউর শেপ’ ফ্যাশান হাউজ থেকে আসছি।ডিম্পি আগারওয়াল আপনার জ্যাকেট ডিজাইন করবেন।তাই মাপের জন্য… “
কেমন যেন দম বন্ধ করা অনুভূতি। বুকটা ধুরধুর করছে।
কি বলে কি লোকটা? হ্যাঁ ও শুনেছে অ্যাডভোকেট শ্যামলী রয় মানে মা,মৃত্যুঞ্জয়ের মা বলেছিলেন ওর অনারে একটা পার্টি দেবেন।ওনার মহলের চেনা পরিচিত সবার সামনে আনবেন নিজের ছেলেকে কিন্তু তার জন্য এত আয়োজন? ডিজাইনার নিজের লোক পাঠিয়ে মাপ নিয়ে যাবে মৃত্যুঞ্জয়ের?
যে শীত গ্রীষ্ম বর্ষা মোটা প্লাস্টিকের মতন কাপড়ের শার্ট পরে এসেছে।কত শখ হয়েছে ব্র‍্যান্ডের টিশার্ট কি শার্ট কেনার!কিন্তু পারেনি! আর আজ?
আজ খাবার টেবিলে থাকে কত রকম বাহারি সব খাবার।হ্যাম বার্গার পিজ্জা টরটিলা চিকেন সসেজ বাটার মেওনিজ মুজ..
দুপুরে লাঞ্চে চিকেন মাটন ইলিশ হরেক রকম মাছ।
নরম বিছানা। ফুরফুরে সাবানের গন্ধ মাখা বেড শিট।গ্লাস ওয়ালের বাইরে সবুজ মোড়া বাগান।ফুল পাখি।এ যেন নরক থেকে স্বর্গে উত্তরণ।
ঘুম পায়।ক্লান্তি আসে।বুক ভরা সন্তুষ্টি। শুধু একটা বঞ্চনার অতৃপ্তি। মনে মনে শাপ দেয় ও সুলেখাকে।ওর পাপ কর্মের সাজা যেন সে পায়।
সাজা নিশ্চয়ই পাবে যেখানে সাজা দেয় মৃত্যুঞ্জয়ের মা।দু’দিন আগে বেশ বায়না করেই মা’র সঙ্গে মা’র গাড়িতে গিয়েছিল কোর্টে।বড়ো ইচ্ছে জাগছিল মাকে কালো কোট পরে লড়তে দেখার।
টিভিতে দেখেছে কিন্তু তা বলে সামনাসামনি?
সাবলীল ভাবে শ্যামলী দলিল পেশ করছিল।কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ভিকটিম কি না শেষমেশ অ্যাকিউজড এ পরিণত হল।ভাবতে পারেনি মৃত্যুঞ্জয় একটা রোগা প্যাকাটে চেহারার মেয়ে যে নাকি নিজেই ভয়ে থরথর করে কাঁপছে সে তার হাজবেন্ডের খুন করতে পারে?কিন্তু মা কেমন ঘুরিয়ে দিল কেস।
গাড়িতে উঠে এ কথা অবশ্য মা’কে জিজ্ঞেস করল…. “ মেয়েটাকে দেখে তো খুব সহজ সরল মনে হচ্ছিল!আর তুমি কি করে ওকে ধরলে?প্রুভ করলেও তো কি ইজিলি!”
শ্যামলী ছেলের চুল ঘেঁটে দেয়….”এর জন্য চাই ধারাল চোখ আর মগজ।আমার ইচ্ছে গ্র‍্যাজুয়েশন সেরে তুমি ল পড়ে নাও।তারপর জয়েন কর আমার আর বাপির ফার্ম!কেমন?”
আদরে মা’র কাঁধে মৃত্যুঞ্জয় মাথা রাখে।
বাপিও তো কম নয়।তার অভিযোগ মৃত্যুঞ্জয় খালি মা’কে সময় দেয়।অ্যাডভোকেট অয়ন রয় ছেলের পিঠ চাপড়ে বলেন….”হেই চ্যাপ চল তোমায় গল্ফ খেলায় নিয়ে যাই।তুমি আমার ছেলে।অ্যাডভোকেট অয়ন রয়ের ছেলে!কি গার্লফ্রেন্ড আছে না কি কয়েকজনের সঙ্গে ইনট্রো করাবো?এখনই তো এনজয় করবে!মাম্মাস বয় হয়ে থেকো না চ্যাম্প।ইউ নিড টু গ্রো আপ..তোমার চলন বলন রহেন সহেন সব বদলাতে হবে!”
বিছানায় শরীর টানটান করে মৃত্যুঞ্জয়। হাই তোলে। সময় কাটতে চায় না।একবার পুরনো বন্ধুদের কথা মনে পড়ে আবার নাকে আসে বস্তির পাকের গন্ধ।ও সব অতীত। ও সব ভুলে গা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারলেই এগোতে পারবে।
বিছানা থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসে ডাইনিং হলে।লম্বা ডাইনিং টেবিল।এক সঙ্গে বারো জন বসে খেতে পারবে।কাঠের চকচকে মেঝে।ডাইনিং টেবিলের উত্তর পূর্ব দিকের গ্লাস ওয়াল দিয়ে দেখা যায় ওদের বাগান।প্রচুর আলো এখানে।টেবিলে রাখা আঙুরের থোকা থেকে কটা আঙুর নিয়ে মুখে পুরতে রসের উৎসব।
হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে চলল দক্ষিণ দিকটায়।একেবারে কোনের দিকে মা’য়ের চেম্বার। বাবার চেম্বার বাইরে।আলাদা অফিস আছে তার।আজ শ্যামলী চেম্বারেই আছেন।
দুদিন পর পার্টি।খুব এটিকেট শেখানো হচ্ছে ওকে।বাড়িতে গ্রুমিং এর লোক আসে।ইংরেজি শেখায়।হাঁটা দাঁড়ানো মানুষের সঙ্গে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে কিভাবে তাকিয়ে কতটা হেসে কথা বলা উচিত তার ট্রেনিং। এক এক সময় হাসি পাচ্ছে মৃত্যুঞ্জয়ের।
মায়ের চেম্বারের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছে ভিতরে ঢোকাটা এটিকেটের ভিতর পড়বে?
কানে একটা দমকা হাসি এল।
তারপর কথা গুলো বড়ো স্পষ্ট। কেউ একজন বলছে…..”ম্যাডাম আপনি টাকার হকদার!এমন কেস সাজালেন যে ভাইয়ের বউ গেল জেলে আর ভাইকে দালাল লাগিয়ে খুন করিয়ে প্রপার্টি পেলাম আমরা!”
শ্যামলীর কন্ঠস্বর স্পষ্ট….. “আমি এর আগেও ভিকটিমকে অ্যাকিউজড করেছি।নয়নাগাছির কেসটা জানেন তো?”
….”সে আর বলতে!আপনার রিসার্চ টিম ভালো! “
…”আরে এ জন্য বুদ্ধি লাগে বুদ্ধি!নইলে ‘পিডিসি’ ব্যাঙ্কের ম্যানেজার হিরালাল কি করে ফাঁসল?যেখানে টাকার রসিদ ওর নামে কাটা হয়েছে আর সই ছিল জালি।এখন সে হাজতে!আর যারা ক্লায়েন্টদের টাকা গাপ করল তারা ফ্রি।কারণ তারা আমাকে হায়ার করেছিল!”
ভয়ংকর অট্টহাস্যে ফেটে পড়ছে ঘরটা।
মৃত্যুঞ্জয় স্তব্ধ। এ সব কি শুনল?ঠিক বুঝল তো?
মাথা ঝিমঝিম করছে।কেমন গা গুলোচ্ছে।পৃথিবী কি টলছে ওর সামনে?
এরপর?
এরপরে দু’দিন গেল ঘোরে।বাপি গেল দিল্লি।একটা কেসে।মা মুম্বাইয়ের একটা আর্ট এগজিবিশনের বিশেষ অতিথি হয়ে।
পার্টির দিন ওরা ফিরল।সারা বাড়ি নতুন বউয়ের মতন সেজে উঠেছে।
শ্যামলী নিজেও আজ যেন অষ্ঠাদশী।
অয়ন সিনেমার সুদর্শন নায়ক।
ওদের পার্টি হবে বাইরের লনে।কিছু আয়োজন ডাইনিং হলে।বার কাউন্টার বসেছে বাইরে।উর্দি পরা বার টেন্ডার অ্যাটেন্ড করছে অতিথিদের।ট্রে হাতে দেশি চিকেন পকোড়া আর বিদেশি চিজ কর্ন ফ্রাই সার্ভ করছে লাল পাগড়ি পরা ওয়েটার।
গান শোনাচ্ছে রিয়েলিটি শোয়ের কন্টেস্টটেন্ট।
পাথরের মূর্তির মতন দাঁড়িয়ে মৃত্যুঞ্জয়।
শ্যামলী একটা সময় ওর কাছে এসে বললেন…”পার্টি এনজয় করছ তো?”
মৃত্যুঞ্জয় বোবা চোখে তাকাল।
….”আই আন্ডারস্ট্যান্ড। প্রথম বার এরকম পার্টি দেখছ তাই নার্ভাস ফিল করছ!”
অনেক কষ্টে শ্যামলীর হাত টেনে ধরল মৃত্যুঞ্জয়…… “এরা যারা এসেছে এরা কি সবাই দুনম্বরী করে?”
…”আর ইউ ক্রেজি?কি আবল তাবল বকছ?এরা সব হাইপ্রোফাইল লোকজন! ভবিষ্যতে এদের সঙ্গে তোমায় কাজ করতে হবে!”

…”বুবাই!”
ডাকটায় বুকটা ধক করে উঠল মৃত্যুঞ্জয়ের।পিছন ফিরে দেখে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যা আর প্রতাপ।
শ্যামলী হিসহিসিয়ে ওঠে ওদের দেখা মাত্রই।প্রায় তেড়ে যায়….”ইউ ব্লাডি ডাউন মার্কেট!এখানে আসার সাহস করলে কি করে? তুমি জান আমার ছেলেকে কিডন্যাপের অপরাধে তোমাদের জেলে ভরতে পারি?”
দু হাত নেড়ে সন্ধ্যা বলে… “বিশ্বাস করুন দিদি জানতুম না যে ও এত বড়ো বাড়ির ছেলে।ওকে যে নিয়ে এসেছিল সে ওর জীবন নষ্ট করে দিতে চাইছিল।আমি তো ওকে..”
….”স টা প…বিনা কাগজ পত্র দেখে কি করে বাচ্চা অ্যাডাপ্ট করো?ও তো একটা অশিক্ষিত বেশ্যা। আপনি কি করছিলেন? “প্রতাপকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করে শ্যামলী।
প্রতাপ জোর হাতে বলেন….”দিদি ভুল করে ফেলেছি।আজ জানতাম না আপনার বাড়িতে আয়োজন আছে।আমরা এখুনি চলে যাচ্ছি।সন্ধ্যা খালি বুবাই বুবাই করে কাঁদে তাই আজ নিয়ে এলাম!”
ওরা একবার শুধু মমতায় তাকাল মৃত্যুঞ্জয়ের দিকে।সন্ধ্যা দু হাত তুলে আশীর্বাদ করে দু চোখ জলে ভাসায়।
ওরা যখন চলে যাচ্ছে তখন বুকের ভিতর গুড়িয়ে যাচ্ছিল মৃত্যুঞ্জয়ের। চিৎকার করে ডাকতে ইচ্ছে করছিল, মা….
কিন্তু এদের এটিকেট এসবের অনুমতি দেয় না।
মৃত্যুঞ্জয়ের চোখ ঝাপসা। শ্যামলী পিঠে হাত রাখল….”পাস্ট ভুলে এগোতে হবে মৃত্যুঞ্জয়। “
পেট মোটা টাক মাথা এক ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন শ্যামলী…. “ইনি ইন্ড্রাস্ট্রিয়ালিস্ট অমর গুহা!আর এ হল আমার ছেলে। বিদেশে পড়ছিল এখন দেশে ফিরেছে!”
….”হ্যাল্লো জেন্টলম্যান! “ভদ্রলোক হাত বাড়ালেন।
মৃত্যুঞ্জয় তখনো ঘোরে।
শ্যামলী পিঠে হাত রাখেন….”কি বলছে মিস্টার গুহা তোমায়?”
দু হাত জরো করে মৃত্যুঞ্জয়…. “অ্যাডভোকেট শ্যামলী রয় কেবল আমার বায়োলজিক্যাল মাদার।আমার প্রকৃত মা সন্ধ্যা বক্সী।ওনাকে ছাড়া আমি সত্যি কাউকে মা ভাবতে পারি না!”
কথাটা এতটা স্পষ্ট আর জোরে ছিল যে আশপাশের অনেকের কানে গেল।মৌচাকে ঢিল পড়ার পরের গুনগুন রব শুরু হল তারপর।
ওর হাত এক ঝটকায় টেনে শ্যামলী বললেন….”সেন্স কাজ করা কি বন্ধ হয়ে গেল?ওই মেয়েছেলেটা কি কিছু খাইয়েছিল? কোনো টোনা টোটকা করল নাকি তোমার ওপর?”
দু পাশে মাথা নাড়ল মৃত্যুঞ্জয়….”বড়ো সিধে সাধা একজন মেয়েমানুষ সন্ধ্যা বক্সী।মিথ্যে বলতে জানে না!তাই যে সত্য লুকিয়ে এসেছে তা সামনে এলে স্বীকার করতেও সে পিছপা হয় না।কারণ সে জানে সে নির্দোষ। সৎ তাই কারচুপির প্রয়োজন নেই।আর সন্ধ্যা বক্সীর সব চাইতে বড়ো দুষ্কর্ম হল সে মৃত্যুঞ্জয় বক্সীকে মানুষ করে ফেলেছে।আর এই মৃত্যুঞ্জয় বক্সী চাইলেও আর পতিত হতে পারবে না!”
….”মৃত্যুঞ্জয়! “চাপা স্বরে ধমকায় শ্যামলী।
অয়নও এসেছে ওখানে। বিরক্ত হয়ে বলে…..”কি ড্রামা হচ্ছে এ সব?”
হাত জোর করে মৃত্যুঞ্জয়….”আমায় মাফ করবেন।আপনাদের এই সাজানো বাগানে আমার মতন বুনো গাছ বড়োই বেমানান!”
গায়ের জ্যাকেট মাটিতে ফেলে হাঁটা দেয় মৃত্যুঞ্জয়।পিছনে ডাকে শ্যামলী… “ভুল করছ তুমি।ফিরে তোমায় আসতেই হবে!”
মৃত্যুঞ্জয় পিছন ফিরেই হাত নাড়ে।
তারপর ওদের বাগদিপাড়ার এঁদো গলির বস্তির ভিতর বাড়ির দরজাটায় কড়া নাড়ে।
সন্ধ্যা দরজা খুলে বিস্মিত হয়।
ঘরে ঢুকে মৃত্যুঞ্জয় বসে পড়ে বিছানায়….”বড়ো খিদে পেয়েছে।একটু ডাল ভাত তোমার হাতে মেখে দিতে পার মা?”
কান্নায় ভেঙে পড়ে সন্ধ্যা।
মা’কে জড়িয়ে ধরে সে দু বাহুতে….”একটু নয় দেরি হল কিন্তু ভোর তবু যে হল মা!আমাকে কি মাফ করা যায় না?”
ছেলেকে বুকে আঁকড়ে ধরে সন্ধ্যা।প্রতাপ ভেজা চোখে তাকিয়ে।
মৃত্যুঞ্জয়ের নাকে আসছে সন্ধ্যার গায়ের ঘামের অম্ল গন্ধ।
কি চেনা আর পবিত্র এ ঘ্রাণ।
মৃত্যুঞ্জয় আজ গন্ধ চিনে গেছে আর কি দ্বন্দ্ব থাকতে পারে অস্তিত্বের আর পরিচয়ের!

রিপোস্ট

(লাইক কমেন্ট শেয়ার করার অনুরোধ রইল)

রিমা_বিশ্বাসের_কলমে


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন