বিয়ের আগে রাফি ভাবত, ভালোবাসা খুব সহজ একটা বিষয়।
ছেলেটা মেয়েটাকে পছন্দ করবে, মেয়েটা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করবে, তারপর দুজন পাশাপাশি হাঁটবে—ব্যস, প্রেম হয়ে গেল।
কিন্তু নীলার সঙ্গে পরিচয়ের পর রাফি বুঝল, ভালোবাসা আসলে অঙ্কের চেয়েও কঠিন।
কারণ অঙ্কে অন্তত ভুল উত্তর বের হলে শিক্ষক বলে দেন—“ভুল হয়েছে।”
নীলা কখনোই সেটা বলত না।
বরং বলত,
—“কিছু না।”
আর রাফি জানত, এই “কিছু না”-এর ভেতরেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিপদ লুকিয়ে আছে।
নীলার সঙ্গে রাফির প্রথম দেখা হয়েছিল একটা বইয়ের দোকানে।
রাফি একটা গল্পের বই হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ঠিক তখনই পাশ থেকে নীলা একই বইটা নিতে হাত বাড়াল।
দুজনের হাত একসঙ্গে বইয়ের ওপর পড়ল।
রাফি হাত সরিয়ে নিয়ে বলল,
—“আপনি নিন।”
নীলা মুচকি হেসে বলল,
—“আপনি আগে নিয়েছিলেন।”
—“না, আপনি নিন।”
—“আপনি নিন।”
পাঁচ মিনিট পরও বইটা কারও হাতে গেল না।
দোকানের কর্মচারী দূর থেকে বিরক্ত হয়ে বলল,
—“ভাইয়া, আপু, আপনারা বই কিনবেন, নাকি বইটার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবেন?”
দুজনেই হেসে ফেলল।
শেষ পর্যন্ত নীলা বলল,
—“চলুন, বইটা আপনি নিন। আমি পরে পড়ব।”
রাফি সাহস করে বলল,
—“আপনি চাইলে আমার কাছ থেকে নিতে পারেন।”
নীলা তাকিয়ে বলল,
—“বই?”
রাফি একটু থেমে বলল,
—“জি… বই।”
নীলা আবার হাসল।
সেদিনই রাফি বুঝেছিল, মেয়েটার হাসি বিপজ্জনক।
এরপর প্রায় প্রতিদিনই তাদের দেখা হতে লাগল।
কখনো বইয়ের দোকানে, কখনো রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে।
একদিন রাফি সাহস করে নীলাকে বলল,
—“আপনি জানেন, আপনার একটা সমস্যা আছে?”
নীলা অবাক হয়ে বলল,
—“আমার সমস্যা?”
—“জি।”
—“কী সমস্যা?”
রাফি গম্ভীর মুখে বলল,
—“আপনি যখন হাসেন, তখন আমি কী বলতে চেয়েছিলাম সেটা ভুলে যাই।”
নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“তাহলে আপনার স্মৃতিশক্তি খুবই দুর্বল।”
রাফি মাথা নেড়ে বলল,
—“আপনার কারণেই।”
নীলা হেসে বলল,
—“অজুহাত ভালো বানান।”
রাফি মনে মনে বলল,
“প্রেমে পড়েছি।”
মুখে বলল,
—“চা খাবেন?”
দিনগুলো এভাবেই চলে যাচ্ছিল।
একদিন রাফি সিদ্ধান্ত নিল, আজ সে নীলাকে মনের কথাটা বলবেই।
চায়ের দোকানে বসে সে অনেকক্ষণ ধরে কথাটা সাজাল।
“নীলা, তোমাকে আমি পছন্দ করি।”
না, খুব সাধারণ।
“নীলা, তোমাকে ছাড়া আমার জীবন অসম্পূর্ণ।”
এটা বেশি নাটকীয়।
“নীলা, তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।”
এটাও একটু বইয়ের মতো।
শেষ পর্যন্ত সে ঠিক করল, সরাসরি বলবে।
চা আসতেই রাফি গলা পরিষ্কার করে বলল,
—“নীলা, তোমাকে একটা কথা বলব?”
নীলা মোবাইল থেকে চোখ তুলে বলল,
—“বলুন।”
রাফি গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
—“আমি…”
ঠিক তখন পাশের টেবিলের একজন লোক হাঁচি দিয়ে বলল—
—“হ্যাঁচ্ছোওও!”
রাফি ভয় পেয়ে থেমে গেল।
নীলা বলল,
—“আপনি?”
—“আমি… আমি চিনি কম হয়েছে কি না সেটা বলছিলাম।”
নীলা অবাক হয়ে তাকাল।
—“চিনি?”
—“জি। চা-তে চিনি কম।”
নীলা বলল,
—“আমি তো চা খেয়েই বুঝলাম ঠিক আছে।”
রাফি মনে মনে বলল,
“আজও গেল।”
কয়েক দিন পর নীলা নিজেই রাফিকে বলল,
—“আপনি কি আমাকে কিছু বলতে চেয়েছিলেন?”
রাফি অবাক।
—“আপনি কীভাবে জানলেন?”
নীলা মুচকি হেসে বলল,
—“আপনি যখনই কিছু বলতে যান, তখন আপনার কান লাল হয়ে যায়।”
রাফি সঙ্গে সঙ্গে কান ঢেকে ফেলল।
—“সত্যি?”
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে আপনি এতদিন ধরে দেখছিলেন?”
নীলা এবার একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
—“হয়তো।”
রাফি বলল,
—“তাহলে আজ একটা কথা বলি?”
—“বলুন।”
—“আমি আপনাকে ভালোবাসি।”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
রাফির বুক ধড়ফড় করছে।
নীলা ধীরে ধীরে বলল,
—“আপনার একটা ভুল আছে।”
রাফির মুখ শুকিয়ে গেল।
—“কী ভুল?”
নীলা হাসল।
—“আপনি এতদিন ধরে ভাবছিলেন শুধু আপনিই প্রেমে পড়েছেন।”
রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“মানে?”
নীলা বলল,
—“মানে আমিও অনেক আগেই পড়ে গেছি।”
রাফি আনন্দে এমনভাবে উঠে দাঁড়াল যে তার চেয়ার পিছনে পড়ে গেল।
চায়ের দোকানের সবাই তাকিয়ে রইল।
দোকানদার বলল,
—“ভাই, প্রেম করেছেন ভালো কথা। চেয়ারটার কী দোষ?”
নীলা হেসে বলল,
—“ওর প্রেম একটু বেশি হয়েছে।”
রাফি চেয়ারটা তুলে বলল,
—“চেয়ার না, হৃদয়টা পড়েছে।”
দোকানদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—“বুঝলাম। আজ থেকে প্রেমিকদের জন্য আলাদা চেয়ার রাখতে হবে।”
নীলা হেসে ফেলল।
রাফিও হাসল।
আর সেই দিন রাফি বুঝল—
ভালোবাসা সত্যিই অঙ্কের মতো নয়।
এখানে ভুল উত্তর বলে কিছু নেই।
শুধু একজন সঠিক মানুষ থাকে, যার সঙ্গে ভুল করেও হাসতে ভালো লাগে।
আর সেই মানুষটি পাশে থাকলে, সাধারণ একটা চায়ের কাপও কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্প হয়ে যায়।
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন