ভুল মানুষ
রাত তখন প্রায় শেষ।
কিন্তু মেহরীনের মনে হলো—
আসল রাতটা যেন এখনই শুরু হলো।
আরিয়ানের শেষ কথাটা বারবার মাথার ভেতর ঘুরছে—
“তুমি ভুল মানুষকে মনে রেখেছ।”
মেহরীন ধীরে ধীরে ছবিটা টেবিলের ওপর রাখল।
—তাহলে আমি কাকে মনে রেখেছি?
আরিয়ান কোনো উত্তর দিল না।
মায়া এবার এগিয়ে এসে বলল—
—হয়তো তোমার মনে থাকা আর সত্যি—দুটো এক নয়।
মেহরীন তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।
—তুমি কী জানো, মায়া?
মায়া চুপ।
M-2 হঠাৎ বলল—
—সবাই কিছু না কিছু জানে।
মেহরীন তার দিকে ফিরল।
—তুমিও?
—হ্যাঁ।
—তাহলে এতদিন আমাকে বলোনি কেন?
M-2 কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—
—কারণ তুমি জানতে চাইলেও তোমার জন্য উত্তরটা প্রস্তুত ছিল না।
মেহরীন বিরক্ত হয়ে বলল—
—আমার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তোমাদের কে দিয়েছে?
কেউ কথা বলল না।
হঠাৎ মেহরীনের চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা ০৩/M টোকেনটার দিকে।
টোকেনটা সে হাতে নিতেই অদ্ভুত একটা শব্দ শুনতে পেল।
টিক… টিক… টিক…
সে অবাক হয়ে টোকেনটা কানের কাছে ধরল।
শব্দটা আরও স্পষ্ট।
মনে হলো—
টোকেনের ভেতর কোনো ছোট যন্ত্র চলছে।
আরিয়ান দ্রুত এগিয়ে এসে বলল—
—ওটা আমাকে দাও।
মেহরীন হাত সরিয়ে নিল।
—না।
—মেহরীন, দাও।
—কেন?
আরিয়ান এবার গম্ভীর হয়ে গেল।
—কারণ ওটা শুধু একটা টোকেন নয়।
মেহরীন ধীরে বলল—
—তাহলে কী?
M-2 বলল—
—একটা চাবি।
মেহরীনের বুক কেঁপে উঠল।
—কিসের চাবি?
M-2 উত্তর দেওয়ার আগেই টোকেনটার মাঝখানে ক্ষীণ আলো জ্বলে উঠল।
তারপর—
ক্লিক।
টোকেনের নিচের অংশ খুলে গেল।
ভেতর থেকে বের হলো একটা ক্ষুদ্র কাগজ।
মেহরীন কাগজটা খুলল।
মাত্র একটি লাইন লেখা—
“যদি সত্যিই জানতে চাও, ০৩ নম্বর কক্ষের নিচে খুঁজো।”
মেহরীন কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল।
তারপর ফিসফিস করে বলল—
—কিন্তু হাসপাতালটা তো পাঁচ বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে।
আরিয়ান বলল—
—হ্যাঁ।
—তাহলে সেখানে কী আছে?
আরিয়ান উত্তর দিল না।
মায়া হঠাৎ বলল—
—একটা জিনিস আছে।
মেহরীন তার দিকে তাকাল।
—কী?
মায়া ধীরে ধীরে বলল—
—তোমার লেখা একটা চিঠি।
মেহরীনের চোখ বড় হয়ে গেল।
—আমার?
—হ্যাঁ।
—আমি কাকে লিখেছিলাম?
মায়া এবার আরিয়ানের দিকে তাকাল।
আরিয়ান চোখ বন্ধ করল।
যেন সে জানে—
পরের কথাটা মেহরীনের সবকিছু বদলে দেবে।
মায়া আস্তে বলল—
—তুমি চিঠিটা লিখেছিলে সেই মানুষটাকে, যাকে তুমি এখন আর চিনতে পারছ না।
মেহরীন ছবিটার দিকে তাকাল।
তারপর হঠাৎ তার মাথায় আরেকটা দৃশ্য ঝলকে উঠল—
একটি অন্ধকার ঘর।
একটি টেবিল।
সাদা কাগজ।
তার নিজের হাত।
কলম দিয়ে সে লিখছে—
“আরিয়ান, যদি কোনোদিন আমি তোমাকে চিনতে না পারি…”
দৃশ্যটা হঠাৎ থেমে গেল।
মেহরীন হাঁপাতে হাঁপাতে চোখ খুলল।
—আমি… আরিয়ানকে চিঠি লিখেছিলাম?
আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে রইল।
কিন্তু এবার তার চোখে ভয়।
মেহরীন বুঝতে পারল—
সে প্রথমবার সত্যিই ভয় পেয়েছে।
—আরিয়ান?
আরিয়ান ধীরে ধীরে বলল—
—চিঠিটা আমার জন্য ছিল না।
মেহরীনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—তাহলে কার জন্য?
আরিয়ান উত্তর দেওয়ার আগেই ফোনে আবার একটি ছবি এল।
ছবিতে—
হাসপাতালের ০৩ নম্বর কক্ষ।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মেহরীন।
তার হাতে একটি চিঠি।
আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মুখ এবার সম্পূর্ণ পরিষ্কার।
মেহরীন ছবিটার দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেলল।
কারণ মানুষটি আরিয়ানের মতো দেখতে নয়।
মানুষটি আরিয়ানই।
আর ছবির নিচে লেখা—
“তুমি যাকে আজ আরিয়ান বলে ডাকছ, সে আসল আরিয়ান নয়।”
চলবে…
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন