আকাশটা সেদিন অদ্ভুত ধূসর ছিল।
ঢাকার রাস্তাগুলোতে মানুষের ভিড় থাকলেও সেই ভিড়ে আর আগের মতো প্রাণ নেই। সবাই ক্লান্ত, অবসন্ন, ক্ষুধার্ত। দোকানের সামনে লম্বা লাইন—কেউ এক মুঠো চালের জন্য দাঁড়িয়ে আছে, কেউ আধা কেজি আটা পাওয়ার আশায়।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পৃথিবীর অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও ভয়াবহ সংকটে পড়ে গেছে।
বাইরের দেশগুলো থেকে খাদ্য আমদানি প্রায় বন্ধ। জাহাজ আসছে না। আকাশপথেও পরিবহন কমে গেছে। তেলের অভাবে বাস, ট্রাক, লঞ্চ—সবকিছু প্রায় বন্ধ হয়ে আছে।
বাজারে গেলে এখন আর আগের মতো খাবার পাওয়া যায় না।
একটা সময় যে বাজারে মাছ, মাংস, সবজি আর ফল থাকত, এখন সেখানে কেবল ধুলো আর হতাশা।
মানুষের মুখে একটাই কথা—
খাবার কোথায়?
অনেক পরিবার দিনে একবারও ঠিকমতো খেতে পারে না।
শহরের বিভিন্ন জায়গায় মানুষ না খেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ছে। কেউ কেউ আবার রাস্তাতেই মারা যাচ্ছে।
এমনই এক কঠিন সময়ের মধ্যে ছোট্ট একটা ঘরে বসে ছিল আছিয়া।
আছিয়ার বয়স প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি। জীবনের অনেক কষ্ট সে দেখেছে। কিন্তু এমন সময় সে আগে কখনো দেখেনি।
তার সামনে একটা পুরোনো অ্যালুমিনিয়ামের থালা। থালার মধ্যে সামান্য ভাত আর একটু লবণ।
তার মেয়ে সারা চুপচাপ বসে আছে পাশে।
আর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে তার ছেলে—হোসেন।
হোসেনের মুখে ক্লান্তি স্পষ্ট। সারাদিন কাজ খুঁজে বেড়িয়েছে, কিন্তু কিছুই পায়নি।
আছিয়া ধীরে বলল,
কিছু কাজ পেলি?
হোসেন মাথা নেড়ে বলল,
না মা… আজও কিছু পেলাম না।
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল।
সারা আস্তে বলল,আমাদের চাল তো প্রায় শেষ।
আছিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর থালাটা সামনে ঠেলে দিয়ে বলল,
তোরা খা। আমি পরে খাব।
হোসেন জানে—
এই কথার মানে হচ্ছে আছিয়া আজ আর খাবে না।
সে বলল,
না মা, তুমি আগে খাও।
আছিয়া একটু হাসার চেষ্টা করল।
সেই হাসিতে আনন্দ নেই, আছে শুধু ক্লান্তি।
বাইরে তখন হালকা বাতাস বইছে।
এই শহরে এখন প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে।
হোসেন দরজার বাইরে তাকাল।
রাস্তার ওপাশে একটা মানুষ বসে আছে। খুব শুকনো, দুর্বল।
মনে হচ্ছে বহুদিন কিছু খায়নি।
হোসেনের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
সে ভাবল—
এই পৃথিবী কি সত্যিই এমন হয়ে গেছে?
ভেতরে বসে আছিয়া জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার চোখে এক অদ্ভুত দৃষ্টি।
মনে হচ্ছিল সে অনেক গভীর কিছু ভাবছে।
এই দুর্ভিক্ষ…
এই ক্ষুধা…
এই মৃত্যুর মিছিল—
সবকিছু তার ভেতরে এক অদ্ভুত আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে।
সে ধীরে ধীরে বলল,
—মানুষ এভাবে না খেয়ে মরতে পারে না…
হোসেন অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল।
আছিয়া আবার বলল,
—যত কষ্টই হোক… মানুষকে খেতে হবে।
সারা মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো—
মায়ের কণ্ঠে আজ অদ্ভুত একটা দৃঢ়তা।
বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
শহরের আকাশে আলো কমে গেছে।
সকালের সূর্য উঠেছে, শহরের মুখে কোনো উজ্জ্বলতা নেই।
আগে এই শহরের সকাল ছিল খুব ব্যস্ত। রাস্তায় গাড়ির শব্দ, মানুষের তাড়াহুড়া, দোকানের ঝাঁপ খোলার আওয়াজ—সব মিলিয়ে একটা জীবন্ত পরিবেশ থাকত।
এখন সেই শহর অন্য এক পৃথিবী।
রাস্তার পাশে অনেক মানুষ বসে আছে। কারও চোখে শক্তি নেই, কারও মুখ শুকিয়ে গেছে।
একটা ছোট ছেলে তার মায়ের কাপড় ধরে বলছে—
মা, আমি খুব ক্ষুধার্ত…
মহিলাটা কিছু বলছে না। তার চোখে পানি। কারণ সে জানে—তার কাছে ছেলেকে দেওয়ার মতো কিছু নেই।
বাজারের দিকে গেলে আরও ভয়াবহ দৃশ্য দেখা যায়।
আগে যে বাজারে মাছ আর মাংসের দোকানগুলো ভরা থাকত, এখন বেশিরভাগ দোকান বন্ধ।
যেগুলো খোলা আছে, সেখানে খাবারের দাম এত বেশি যে সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারে না।
এক কেজি চালের দাম কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, যদি একটু চাল পাওয়া যায়।
কেউ কেউ খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে।
কেউ আবার হতাশ হয়ে বসে পড়ছে রাস্তার পাশে।
এই শহরে এখন ক্ষুধা এক অদৃশ্য দানব হয়ে গেছে।
সে ধীরে ধীরে মানুষের শক্তি, আশা, আর জীবন কেড়ে নিচ্ছে।
এই অবস্থার মধ্যেই হোসেন হাঁটছিল।
তার পায়ের স্যান্ডেল প্রায় ছিঁড়ে গেছে। শার্টটা পুরোনো। কিন্তু সে তবুও কাজ খুঁজছে।
কারণ সে জানে—
আজ যদি কাজ না পায়, তাহলে হয়তো রাতে তার মা আর বোনের জন্য খাবার থাকবে না।
সে একটা গুদামের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
ভেতরে কয়েকজন লোক মাল তুলছে।
হোসেন আশা নিয়ে বলল—
ভাই, কোনো কাজ আছে?
একজন লোক তাকিয়ে বলল,
না। এখন লোক নেওয়া বন্ধ।
হোসেন মাথা নিচু করে চলে গেল।
এভাবে সে একের পর এক জায়গায় গেল।
কিন্তু কোথাও কাজ নেই।
দুপুরের দিকে রোদ খুব গরম হয়ে উঠল।
ক্ষুধায় তার মাথা ঘুরতে লাগল।
সে রাস্তার পাশে বসে পড়ল।
ঠিক তখনই সে দেখল—একটা ভিক্ষুক ধীরে ধীরে হাঁটছে।
লোকটার অবস্থা খুব খারাপ। তার শরীর এত দুর্বল যে মনে হচ্ছে যে কোনো সময় পড়ে যাবে।
হোসেন তাকিয়ে থাকল।
হঠাৎ ভিক্ষুকটা রাস্তার মাঝখানে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল।
চারপাশের মানুষ কেউ এগিয়ে এল না।
কারণ সবাই নিজেই নিজের কষ্টে ডুবে আছে।
হোসেন দৌড়ে গিয়ে তাকে উঠাল।
ভিক্ষুকের চোখ আধা বন্ধ।
সে দুর্বল কণ্ঠে বলল—
খাবার… একটু খাবার…
হোসেনের বুকটা কেঁপে উঠল।
কিন্তু তার নিজের কাছেও তো কিছু নেই।
হোসেন বাড়ি এসে শুনে তার মা কাজ পেয়েছে একটা। এতে তাদের সংসার কোনমতে চলবে৷
হোসেন জিজ্ঞেস করলো কি কাজ?
পাশ থেকে সারা বলে ; লাশকে গোসল দেওয়ার কাজ।
এই কথা শুনতেই হোসেনর বুকের ভেতরটা কেমন ছেদ করে উঠলো । শেষ পর্যন্ত কিনা এই কাজ । অবশ্য এছাড়া আর কি বা করার আছে যেই হারে মানুষ মরছে দুর্ভিক্ষের তাড়নায় । তাই সবচেয়ে সহজে এই কাজটাই পাওয়া যায় ।
দুপুরের রোদটা আজ রাস্তার ওপর আগুন ঢেলে দিয়েছে। চারপাশের রাস্তা শুকিয়ে গেছে যেন অনেকদিনকার তৃষ্টান্তরে রাস্তাগুলো একটুখানি পানির আশায় কাতর হয়ে রয়েছে । একটুখানি সবুজের চিহ্নও নেই। শুকনো বাতাসে ধুলো উড়ছে, আর দূরের কয়েকটা মৃত গাছের ডালপালা রোদে পুড়ে কালচে হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ভাঙাচোরা রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটা হোটেল। টিনের ছাদটা জং ধরে বাদামি হয়ে গেছে, কোথাও কোথাও টিন বেঁকে নিচের দিকে ঝুলে আছে। দেয়ালের পুরোনো রং উঠে গিয়ে তার নিচের স্যাঁতসেঁতে দাগ বেরিয়ে পড়েছে। দরজার সামনে একটা কাঠের বেঞ্চ, সেটাও এত পুরোনো য
হোটেলটার সামনে ধুলোমাখা একটা সাইনবোর্ড বাতাসে কাঁপছে। অর্ধেক লেখা মুছে গেছে, বাকি অক্ষরগুলোও রোদে বিবর্ণ। ভেতর থেকে ভেসে আসছে পুরোনো ফ্যানের ঘড়ঘড় শব্দ।
এত বিশাল ধ্বংসস্তূপের মতো নির্জনতার মধ্যে হোটেলটা খুলেছে আসিয়া । এখানে ফ্রিতে কম দামে মানুষদের খাওয়ানো হয় । অবশ্য সব সময় বিড় লেগে থাকে আছিয়ার এই হোটেলে ।
এভাবে বেশ কিছুদিন কেটে গেল । এখন আছিয়ারা অনেকটা উন্নত হয়েছে ।
গভীর রাতে হোসেন মনে মনে ভাবছে ;
কাজ করলে টাকা পাওয়া যায় ঠিকই।
কিন্তু এই দুর্ভিক্ষে টাকা থাকলেও তো মাংস পাওয়া যায় না।
হোসেন মনে মনে ভাবল—
হয়তো মা কোথাও থেকে কিনেছে।
সে আর বেশি ভাবল না।
অবশেষে ধীরে ধীরে তার ঘুম চলে এল।
পরদিন সকালে শহরের আকাশ ধোঁয়াটে ছিল।
দূরে একটা মসজিদের মাইক থেকে জানাজা নামাজের ঘোষণা ভেসে এল।
এই শহরে এখন মৃত্যু যেন খুব সাধারণ একটা
ঘটনা হয়ে গেছে।
হোসেন বাইরে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
তখন আছিয়া বলল,
—আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস।
—কেন?
আছিয়া বলল,
—কিছু কাজ আছে।
হোসেন মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে দেখল রাস্তার অবস্থা আগের মতোই।
ক্ষুধার্ত মানুষ।
নিঃশব্দ শহর।
দূরে কয়েকটা রিকশা দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু যাত্রী নেই।
সবকিছু যেন থেমে গেছে।
এই সময় আছিয়া ঘরের দরজা বন্ধ করল।
তারপর ধীরে ধীরে সারার দিকে তাকাল।
সন্ধ্যার দিকে হোসেন বাড়ি থেকে ক্লান্ত শরীর নিয়ে আসে । একটু বিশ্রাম নিয়ে রাতে খেতে বসে ।
হঠাৎ খেতে খেতে হোসেন খাবারের মধ্যে চুল পায়
এত বড় আর লম্বা খাবারে অনেক বেশি চুল। খাবারের চুল দেখে গা গিন গিন করে আসে । হোসেন আর খেতে পারে না খাবারটা রেখে দেয় । তাছাড়া আজকের খাবারের মাংসটা থেকে কেমন যেন একটা গন্ধ আসছে ।
আসিয়ার হোটেল টা বেশ খ্যাতি অর্জন করেছে । আর এখানে খুব কম দামে ভালো-মন্দ খেতে পাওয়া যায় । এমন অনেক সময় খাবার হাওয়ায় আছিয়া গরিব দুঃখীদের । তার খাবার আছে বিশ্বাস এক ধরনের সাধ খেতে মন্দ নয়।
হোসেন এক রাতে ঘুমিয়ে আছে । ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আবারও সে বিভিন্ন ধরনের চিন্তা করছে তার মনে কেমন যেন একটা সন্দেহ কাজ করছে । তাদের এমন হঠাৎ উন্নতি তার সন্দেহ এর মূল । এমন সময় একটা শব্দে তার চিন্তাভাবনা থেকে খেল যা বাইরে যায় ।
সে বিছানা থেকে উঠে একটু সামনে গিয়ে দেখে তার মা ও বোন সারা কোথায় যেন যাচ্ছে।
তাও কেমন লুকিয়ে লুকিয়ে কৌতুহল বসত হোসেন ও তাদের পেছন পেছন যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল ।
তাদের পিছন পিছন নিতে নিতে , হোসেন খেয়াল করল তারা দুজন হোটেল টার দেখেই যাচ্ছে । অদূরে একটা মোটা গাছের পেছনে লুকিয়ে আছে হোসেন।
আছিয়া আর সারা তারা দুজন এগিয়ে হোটেলের ভেতর ঢুকলো।
অনেকক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে । হোসেন ও ধীরে ধীরে হোটেলটার দিকে এগিয়ে আছে । ভেতর থেকে কেমন যেন একটা শব্দ আছে ।
কিন্তু উঁকি দিয়ে দেখার মত কোন ফাক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না দরজাটাও বেশ ভালো মত লাগানো । হোটেল হাতে হাতে একটা ফাক খুঁজে পেল হোসেন সেই পুটু দিয়ে দেখছে যে তারা কি করতেছে ।
হঠাৎ হোসেনের চোখ দুটো বড় বড় হয়ে আসলো । তার শরীর ঘামতে শুরু করলো। গলা শুকিয়ে আসলো । হোসেন ঘন ঘন শ্বাস নিতে লাগলো একটা সময় স্থির ভাবে সোজা হয়ে স্ট্যাচু মত দাঁড়িয়ে রইল। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল তার হুশ জ্ঞান নেই । অনেকটা স্বাভাবিক হতেই পেছন নিয়ে যেতে একটা কিছুর সাথে ধাক্কা খেয়ে অনেকগুলো কিছু একটা পড়ে যায় । সেই শব্দে আসিয়া দরজা খুলে দেখে বাইরে কেউ নেই ।
সারা এসে জিজ্ঞেস করছে; কি হয়েছে মা কে ছিল বাইরে?
আসিয়া বলে : জানি না হয়তো বাতাসে কিছু একটা পড়ে গেছে ।
কিন্তু সারা জানে৷ এখানে কোন বাতাস নেই । তাও কথার আগে বাড়ালো না সারা ।
হোসেন সেখান থেকে এক দৌড়ে বাড়ি চলে এসেছে । আতঙ্কে ভয়ে আর হতভাগ এসে পাগল হয়ে গেছে । এটা সে কি দেখেছে নিজের চোখেও তার বিশ্বাস হচ্ছে না।
সে কি আজতে কোন স্বপ্ন দেখছে নিজেকে বারবার মেরে স্বপ্ন থেকে জাগানোর বৃথা চেষ্টা করল।
অনেক রাত হয়েছে । আছিয়া সারা হোটেল থেকে বাড়ি এসেছে । এসে দেখে হোসেন শুয়ে আছে ।
তাকে আর কিছু বললো না তারাও স্বাভাবিকভাবে শুয়ে পড়ল ।
হোসেন ইদানিং কারো সাথে কোন কথা বলে না কেমন ভয়ে ভয়ে আর আতঙ্কে থাকে । বিষয়টা বেশ খেয়াল করেছে আছিয়া।
হোসেন কে আর আগের মত খাবার দিলে খায় না কেমন যেন খাবার নিয়ে ঝিমায় । কেমন যেন চোখ মিলিয়ে ঠিক মতো কথা বলে না ।
হোসেন ও মনে মনে কেমন ভয়ে আছে তার মনে হচ্ছে তার মা আসিয়া ও তার বোন সারা তাকে যেকোনো মুহূর্তে খুন করে ফেলবে । যদি জানতে পারে যে হোসেন তাদের সত্যিটা জেনে গেছে।
তাই হোসেন তাদের থেকে দূরে দূরে থাকে তাদের সাথে মেশেনা কথা বলে না তার মন চাইছে কোথায় এটা পালিয়ে যেতে।
ভয়ে কোন দিন জানি তার হৃদপিণ্ডটা বেরিয়ে আসে নিশ্চয়ই তাকে তারা খুন করবে ।
এসব চিন্তা করতেই সেদিন কার ভয়ানক রাতের কথা তার মনে আসে ।
তার মা আসিয়া যে,
লাশ গোসল দেয় । তা গোসলের পর কবর দেয়া হয় । কিন্তু রাতে করিম মিয়া সেই কবর খুড়ে লাশটাকে বের করে আনে। লাশ কে বের করে আনলে আছিয়া সেই লাশ কেটে অর্ধেক কবর দেয় আর বাকি অর্ধেককে টুকরো টুকরো করে রান্না করে।
আর সেই রান্না করা মাংস সে এতদিন ধরে হোসেন সহ বাকিদের খাইয়ে এসেছে ।
আর এই খাবার খেয়ে কত ভিক্ষুক আছিয়ার জন্য দোয়া করেছে কত মানুষের পেটের ক্ষুদা মিটিয়েছে আছিয়া। এটা ভাবতেই হোসেনের কেমন লাগে ।
এটা হোসেন জানতে পেরে গেছে ।
হোসেন যে এটা জানতে পেরে গেছে আছিয়া এটা অনেক ভালো মতো বুঝতে পেরেছে।
আছিয়া সরাসরি এসে হোসেন কে ধমকি মেরে বলল যে সে যদি এটা কখনো কাউকে তাহলে সে তাকে খুন করে ফেলবে ।
ঠিক যেমনটা হোসেন ভেবেছিল তেমন তাই হয়েছে।
আসলেই তাকে খুন করে ফেলবে কারণ বিষয়টা অনেক দূর পর্যন্ত গড়িয়ে গেছে ।
হোসেন অত্যন্ত ভয় ভয় আছে সত্যি সত্যি তাকে না জানি কোন সময় খুন করে রান্না করে বাকিরা খাইয়ে দিবে ।
এমন সময় আছিয়া নিজেদেরকে আর উন্নত করল তাদের এই কাজে আরও কয়েকজনকে যোগ করল । এভাবে করতে করতে তারা অনেকটাই উন্নত হয়ে গেল একটা চক্র তৈরি হয়ে গেল ।
এই খবরটা অবশ্য পুলিশদের কাছে আরো অনেক গোয়েন্দাদের কাছেও চলে গেছে ।
যে শহরে এরকম একটা মানুষকেখেকো চক্র আছে ।
তখন গোয়েন্দা পুলিশরা নিজেদের মতো অপরাধীদের ধরার চেষ্টা করে । কিন্তু বারবার ব্যর্থ হয় কারন আসিয়া ও সারা এতদিনে পালিয়ে গেছে তারা গা ঢাকা দিয়েছে এবং গোপনে তাদের হোটেল গুলো চালিয়ে যাচ্ছে ।
এভাবে দিন থেকে মাস থেকে বছর কেটে যায় পুরো একটা গ্যাংস্টার পরিণত হয়ে আছিয়া।
তার অনেক দলবল অনেক অনেক খ্যাতি।
হঠাৎ গোয়েন্দাদের কাছে খবর আছে যে আছিয়া একটা গোপন আস্তানায় আছে । তখন পুলিশ টিমসহ সেই আস্তানায় রওনা হয়।
কেবল আর কেবল আসিয়া ও তার পুরো চক্রটাকে ধরার জন্য ।
সেখানে গিয়ে একপ্রকার যুদ্ধ শুরু হয় তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের মত।
একে ওপড়তে গুলি করা, মারপিট করা, লাঠি দিয়ে একজন আরেকজনকে আক্রমণ করা । চারদিকে চলছে শুধু মারপিট। আসিয়ার গোপন আস্থানায় চারদিক ছড়িয়ে ছিটিয়াসের রক্ত মানুষের কাঁথা হাত-পা বিভিন্ন ধরনের ছুরি হাতিয়ার।
এই যুদ্ধে এক সময় পুলিশেরা জিতে যায় তাদেরকে গ্রেফতার করা হয় ।
আর সমাপ্তিত ঘটে এক অন্ধকার জগতের যেখানে ক্ষুধায় ছিল সবকিছুর উর্ধ্বে ।
সবার আগে হচ্ছে খাদ্য তারপরে হচ্ছে বাকি জিনিস , খালি পেটে কখনো পড়তে ভালো লাগে না। খেলতে ভালো লাগেনা না ঘুমাতেও ভালো লাগেনা ।
এই পেটের ক্ষুধার জন্য যুগ যুগ ধরে এত সংগ্রাম।পেটে ক্ষুধা রেখে কখনোই সফলতা অর্জন করা যায় না ।
মানুষের জীবনে যত সংগ্রাম, যত ছুটে চলা, যত কষ্ট—তার পেছনে এই ক্ষুধার তাড়নাই লুকিয়ে থাকে। পেটের ক্ষুধা মানুষকে ঘর ছাড়ায়, আপনজন থেকে দূরে নিয়ে যায়, অসম্ভবকে সম্ভব করার সাহস দেয়। মানুষ সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, অপমান সহ্য করে শুধু একবেলা খাবারের নিশ্চয়তার জন্য। অথচ দিন শেষে পেটটা ভরে গেলে, সেই মানুষটিই হয়তো ভুলে যায়—এই সামান্য তৃপ্তির জন্যই সে এতটা পথ হেঁটেছল…।
আর…. হঠাৎ এক বিদ্যুতের চমকানিতে হোসেনের ঘুম ভেঙ্গে যায় লাফ দিয়ে সে খাটের উপর উঠে বসে ।
এতক্ষণ যাবৎ সে স্বপ্ন দেখছিল তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ক্ষুধা মানুষের সাথে এগুলো সব কিছুই তার স্বপ্ন ছিল ।
এমন এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে হোসেন পুরোই নির্বাক হয়ে গেল এই সবকিছুই তার কাছে এখনো জীবন্ত মনে হচ্ছে ।
পরিশেষে হোসেন কেবলে এতটুকুই বুঝল যে ক্ষুধাই সবার উর্ধ্বে ।
পরিশেষে হোসেনের একটা উপন্যাসের কথা মনে পড়ে গেল
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে কখনো খেতে আসেননি) আসলে কিন্তু তারে পুরো স্বপ্নের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনো খেতে আসেননি ।
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন