শহরের এই কংক্রিটের জঙ্গলটা আজ যেন এক বিশাল খাঁচা। তপ্ত পিচঢালা রাস্তা থেকে আগুনের হল্কা উঠছে। ট্রাফিক সিগন্যালে আটকে থাকা শত শত গাড়ির বিষাক্ত ধোঁয়া আর ঘামের গন্ধে বাতাসটা কেমন যেন স্থবির হয়ে আছে। বাসের ভেতরে তিল ধারণের জায়গা নেই। একেকটি শরীর অন্য একটি শরীরের ওপর স্রেফ টিকে থাকার তাগিদে হেলে পড়ছে। জানালার কাঁচগুলো রোদে তপ্ত হয়ে আছে, হাত ছোঁয়ালে ছ্যাঁত করে ওঠে।
পেছনের একদম কোণের সিটে বসে থাকা হীরার মনে হলো, সে আসলে কোনো বাসে নেই, বরং এক দানবীয় প্রাণীর তপ্ত পাকস্থলীতে বন্দি হয়ে আছে। চারপাশের মানুষের চেহারায় কোনো প্রাণ নেই—সবাই যেন যান্ত্রিক রোবট। অফিসের ফাইলের স্তূপ, সংসারের না ফুরানো অভাব, আর মাস শেষে ঋণের বোঝা সবার কাঁধে সিন্দাবাদের ভূতের মতো চেপে বসেছে। হীরার নিজেও এর বাইরে নয়। তার কোলের ওপর রাখা পুরনো ল্যাপটপ ব্যাগটা সে জাপটে ধরে আছে, যেন ওটাই তার অস্তিত্বের শেষ সম্বল। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলার চেষ্টা করল, কিন্তু বুকের খাঁচাটায় টান ধরল—শহরের এই দূষিত বাতাসে অক্সিজেন যেন বিলাসিতা।
জানালার বাইরে এক চিলতে আকাশ দেখা যাচ্ছে। গোধূলির শেষ রক্তিম আভা তখন মেঘলা আকাশের গায় আলতো করে লেগে আছে। গোধূলির সেই মায়াবী রঙ দেখে হীরার খুব মনে পড়ল তার ফেলে আসা গ্রামের কথা। যেখানে অরণ্যের নিবিড় ছায়া আর সবুজের ঘ্রাণে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়া যেত। যেখানে একটা জরাজীর্ণ বটগাছের নিচে বসে তপ্ত দুপুরেও শীতল হাওয়ার পরশ পাওয়া যেত। আজ সেই সজীবতা কোথায় হারিয়ে গেল? এই যান্ত্রিক শহরে কি মানুষ শুধু যান্ত্রিক হতেই জন্মায়?
হঠাৎ এক শুকনো, খসখসে কাশির শব্দে হীরা ঘোর কাটল। তার পাশের সিটে বসা এক বৃদ্ধ। পরনে মলিন পাঞ্জাবি, চোখে ছানি পড়া ঝাপসা দৃষ্টি। লোকটা খুব কষ্টে নিজের বুকটা দু-হাতে চেপে ধরে আছেন। হীরা দেখল বৃদ্ধের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে, ঠোঁট দুটো নীল হয়ে আসছে। তিনি বড় বড় করে হাঁপাচ্ছেন, যেন অদৃশ্য কোনো জলহস্তী তার বুকের ওপর পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক যেন ডাঙায় তোলা এক বুড়ো মাছ, যে এক ফোঁটা জলের জন্য, এক বিন্দু বাতাসের জন্য শেষ লড়াইটা লড়ছে।
বাসের বাকি যাত্রীরা কেউ নিজের ফোনের উজ্জ্বল স্ক্রিনে মগ্ন, কেউ কানে হেডফোন গুঁজে বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। কেউ কেউ আবার বিরক্তির দৃষ্টিতে বৃদ্ধের দিকে তাকাচ্ছে, যেন এই অসুস্থ মানুষটা তাদের যান্ত্রিক যাত্রায় এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিঘ্ন। মানবিকতা বোধহয় এই শহরে ধুলোর সাথে মিশে গেছে।
হীরা আর স্থির থাকতে পারল না। সে দ্রুত নিজের পানির বোতলটা বের করল। কাঁপা হাতে বৃদ্ধের মুখে জল দিতে দিতে সে জানালার জ্যাম হয়ে থাকা কাঁচটা গায়ের জোরে নিচে নামিয়ে দিল। বৃদ্ধের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সে নিচু স্বরে বলল, “চাচা, ভয় পাবেন না। কিচ্ছু হবে না আপনার। এই তো বাতাস আসছে। একটু বুক ভরে দম নেওয়ার চেষ্টা করুন।”
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন
[239724]supplies professional anti-violence equipments and solutions for the whole world with strong and perfect production capacity. anti-violence.org