ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই গ্রামের চারপাশে যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার হলো। পূর্ব আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ছোট নদীর পানিতে সূর্যের আলো চিকচিক করছে। নদীর তীরে সারি সারি কাশফুল বাতাসে দুলছে। দূরে জেলের নৌকা ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে। খাল-বিলে শাপলা-শালুক ফুটে আছে। সবুজ ধানের ক্ষেত বাতাসে ঢেউ তুলছে। তাল, খেজুর, নারকেল, সুপারি আর আমগাছের ছায়ায় ঢাকা গ্রামটি যেন প্রকৃতির এক অপূর্ব নিদর্শন।
এই গ্রামেরই এক কোণে বাস করত ছোট্ট মেয়ে মল্লিকা। খুব অল্প বয়সেই সে তার বাবাকে হারায়। তার বাবা আবদুল করিম ছিলেন সৎ, পরিশ্রমী ও ধর্মপরায়ণ মানুষ। তিনি মৃত্যুর আগে কিছু জমি, একটি বসতভিটা এবং কয়েক বিঘা আবাদি জমি রেখে যান। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—বাবার মৃত্যুর পর মল্লিকার আশ্রয় হয় তার চাচা রহিম উদ্দিন ও চাচি সালেহা বেগমের বাড়িতে।
প্রথম দিকে তারা মল্লিকাকে আপন সন্তানের মতোই দেখাশোনা করত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের মনে লোভ জন্ম নেয়। তারা ভাবতে লাগল, যদি মল্লিকার নামে থাকা জমিজমা নিজেদের নামে করে নেওয়া যায়, তবে তাদের আর কোনো অভাব থাকবে না।
মল্লিকা তখনও ছোট। সে কিছুই বুঝত না। শুধু মাঝে মাঝে বাবার কথা মনে করে কাঁদত। বাবার লাগানো আমগাছটির নিচে বসে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলত। গ্রামের প্রবীণ লোকেরা তাকে দেখে বলত, “আহারে! এতিমের কষ্ট আল্লাহ ছাড়া আর কে বোঝে!”
গ্রামের মানুষ লক্ষ্য করতে লাগল, রহিম উদ্দিন ধীরে ধীরে মল্লিকার বাবার জমি নিজের মতো করে চাষ করছে। ফসল বিক্রির টাকাও নিজেই রেখে দিচ্ছে। মল্লিকার ভবিষ্যতের জন্য কোনো হিসাব রাখা হচ্ছে না।
একদিন পাশের গ্রামের সম্মানিত চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন বিষয়টি জানতে পারলেন। তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ, সাহসী এবং মানুষের আস্থার প্রতীক। কোনো অন্যায়ের খবর পেলেই তিনি নিজে সেখানে ছুটে যেতেন।
তিনি কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে রহিম উদ্দিনের বাড়িতে এলেন।
চেয়ারম্যান বললেন,
“রহিম ভাই, শুনেছি আপনার ভাইয়ের মেয়ের সম্পত্তি নিয়ে কিছু অভিযোগ উঠেছে। সত্যি কি?”
রহিম উদ্দিন মাথা নিচু করে বলল,
“না চেয়ারম্যান সাহেব, তেমন কিছু নয়।”
কিন্তু গ্রামের অনেকেই তখন সত্য ঘটনা খুলে বললেন। কেউ বললেন জমির কথা, কেউ বললেন ফসলের কথা, আবার কেউ বললেন মল্লিকার প্রতি অবহেলার কথা।
জসিম উদ্দিন শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“এতিমের সম্পদ রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। কেউ যদি তার হক নষ্ট করে, তাহলে শুধু আইনের কাছেই নয়, আল্লাহর কাছেও জবাবদিহি করতে হবে।”
সিদ্ধান্ত হলো, জুমার নামাজের পর মসজিদ প্রাঙ্গণে গ্রামের সালিশ বসবে।
জুমার দিন মসজিদে ছিল মানুষের ঢল। নামাজ শেষে গ্রামের ইমাম সাহেব খুতবার পর সবাইকে উদ্দেশ করে বললেন,
“প্রিয় মুসল্লিগণ, আল্লাহ তাআলা কুরআনে এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। যারা এতিমের সম্পদ অবৈধভাবে গ্রাস করে, তারা নিজেদের পেটে আগুন ভরে।”সাঈদ ইবনু যায়েদ (রাঃ) রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অত্যাচার করে অর্ধহাত যমীন দখল করেছে, নিশ্চয়ই ক্বিয়ামতের দিন অনুরূপ সাতটি যমীন তার কাঁধে ঝুলিয়ে দেয়া হবে’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৯৩৮)।
এই কথা শুনে পুরো মসজিদ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রহিম উদ্দিনের শরীর কেঁপে উঠল। তার চোখে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল। চাচি সালেহাও মাথা নিচু করে কান্না শুরু করলেন।
এরপর সালিশ বসল।
চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন জমির কাগজপত্র পরীক্ষা করলেন। গ্রামের প্রবীণ সাক্ষীদের বক্তব্য শুনলেন। সব প্রমাণে স্পষ্ট হলো—সব সম্পত্তির একমাত্র মালিক মল্লিকা।
চেয়ারম্যান দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
“আজকের এই সালিশে সিদ্ধান্ত হলো, মল্লিকার সমস্ত সম্পত্তি আইন অনুযায়ী তার নামে থাকবে। চাচা কেবল অভিভাবক হিসেবে দেখাশোনা করবেন। কোনো জমি বিক্রি, বন্ধক বা দখল করা যাবে না। প্রতি বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব গ্রামের কয়েকজন বিশ্বস্ত ব্যক্তির সামনে উপস্থাপন করতে হবে।”
রহিম উদ্দিন কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“আমি ভুল করেছি। লোভে পড়ে অন্যায়ের পথে চলে গিয়েছিলাম। আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন।”
তিনি সবার সামনে মল্লিকার কাছে ক্ষমা চাইলেন।
মল্লিকা চোখের পানি মুছে বলল,
“চাচা, আমি আপনাকে ক্ষমা করে দিলাম। কিন্তু আমার বাবার আমানত যেন আর কখনো নষ্ট না হয়।”
সেদিন গ্রামের মানুষ এক বিরল দৃশ্য দেখল। অন্যায়ের ওপর ন্যায়ের বিজয় হলো। সবাই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল।
কয়েক বছর পর মল্লিকা লেখাপড়া শেষ করে একজন শিক্ষিতা ও সৎ নারী হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলো। সে বাবার জমিতে আধুনিক কৃষিকাজ শুরু করল। গ্রামের অসহায় এতিম শিশুদের জন্য একটি ছোট শিক্ষা তহবিল গঠন করল। তার বিশ্বাস ছিল, একজন এতিমের চোখের জল যেন আর কোনো লোভী মানুষের কারণে না ঝরে।
চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন গ্রামের মানুষকে প্রায়ই বলতেন,
“মানুষের সম্পদ রক্ষা করা শুধু আইনের কাজ নয়, এটি ঈমানেরও দাবি। বিশেষ করে এতিমের হক আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।”
গ্রামের নদী তখনও আগের মতোই বয়ে চলেছে। খাল-বিলে জেলেরা মাছ ধরছে। মাঠে সোনালি ধান দুলছে। সন্ধ্যায় মসজিদের মিনার থেকে আজান ভেসে আসে। সেই সুর যেন সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেয়—দুনিয়ার সব সম্পদ একদিন রেখে যেতে হবে; কিন্তু ন্যায়, আমানতদারি এবং মানুষের হক আদায়ের প্রতিদান আল্লাহর কাছে চিরস্থায়ী।
নৈতিক শিক্ষা:
অন্যের সম্পত্তি, বিশেষ করে এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা ইসলামে মহাপাপ। দুনিয়ায় সাময়িক লাভ হলেও আখিরাতে এর কঠিন শাস্তি রয়েছে। তাই ন্যায় প্রতিষ্ঠা, আমানত রক্ষা এবং দুর্বল মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই একজন প্রকৃত মুমিনের পরিচয়।
শেষ কলমে, মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
Copyright and all rights reserved by author.
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন