“শরতের আকাশ”
সকল ঋতুর ভিড়ে
আমার প্রিয়তম ঋতু শরৎকাল,
নীল আকাশের বিস্তীর্ণ বুকে
সাদা মেঘের মধুর ভেসে চলা।
তুলোর মতো শুভ্র মেঘ
ভাসে নীল আকাশের বুকে,
মৃদু রোদের কোমল হাসি ছড়িয়ে
প্রকৃতি সেজে ওঠে নব মায়ায়।
কাশফুল দোলে নদীর তীরে,
শুভ্র ঢেউ ওঠে মাঠের প্রান্তে,
শিউলি ঝরে প্রভাতের হাওয়ায়,
সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে।
শিশিরস্নাত ঘাসের ডগায়
মুক্তোর মতো ঝিলিক খেলে,
পাখির কলতানে প্রভাত জাগে,
মনও জেগে ওঠে আনন্দে ভরে।
নদীর বুকে জেগে ওঠে চর,
স্বচ্ছ জলে রোদের খেলা,
দূর দিগন্তে নৌকার সারি—
নদীজুড়ে চিত্রময় মেলা।
ধানের ক্ষেতে সবুজ ঢেউ,
শীষে শীষে সোনালি স্বপ্ন,
কৃষকের চোখে নব আশার দীপ্তি,
গোলাভরা ফসলের প্রত্যাশা।
শরৎ এলেই মনে পড়ে যায়
আমার শৈশবের দিনগুলি,
কাশবনের ভেতর দিয়ে
ছুটে যেতাম প্রতিদিন।
নদীর চরে বন্ধুদের সঙ্গে
হতো কত রঙিন খেলা,
কাগজের নৌকা বানিয়ে
ভাসাতাম জলের বুকে।
ভোরবেলায় শিউলি কুড়িয়ে
ভরাতাম ছোট্ট ঝুড়ি,
কে বেশি ফুল তুলবে—
চলত আনন্দময় প্রতিযোগিতা।
পূজোর আগে নতুন জামার
ছিল অপার উচ্ছ্বাস,
কবে আসবে ষষ্ঠীর সকাল—
গুনতাম প্রতীক্ষার প্রহর।
হঠাৎ দূরে ঢাকের বাদ্য
ভেসে আসত কানে,
মনে হতো—মা যেন এসেছেন
সন্তানদের আহ্বানে।
মণ্ডপজুড়ে আলোর মালা,
সাজে পাড়া-পথঘাট,
ধূপের গন্ধ, শঙ্খধ্বনি—
আনন্দে ভরে ওঠে মন।
মায়ের মুখের মধুর হাসি,
দশভুজার অপূর্ব রূপ,
অঞ্জলি দিতে দাঁড়িয়ে থাকতাম,
বিস্ময়ে ভরে যেত শিশুমন।
বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপ ঘুরে ঘুরে
দেখতাম নানা আয়োজন,
নতুন পোশাকে সেজে উঠত
ছোট্ট হৃদয়ের উচ্ছ্বাস।
সন্ধ্যার আরতি, প্রদীপের আলো,
কাঁসর-ঘণ্টার ধ্বনি,
উলুধ্বনিতে মুখর হতো
গ্রামবাংলার চারপাশ।
ঢাকের তালে ধুনুচি নাচে,
উৎসবে মাতে প্রাণ,
দুর্গোৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে
মুখর হয়ে ওঠে গ্রাম।
তারপর আসে বিজয়া দশমী,
বিদায়ের বিষণ্ন ক্ষণ,
মায়ের বিদায় দর্শনে
ভারাক্রান্ত হয় মন।
বিসর্জনের নদীর ঘাটে,
ঢাকের বিষাদময় সুর,
‘আবার এসো মা’—এই প্রার্থনায়
মন থাকে আশায় পূর্ণ।
বিকেল নামে সোনালি আভায়,
সূর্য ডোবে পশ্চিমে,
সাঁঝের আকাশ লালিমা মেখে
নীরব বার্তা দেয় প্রাণে।
রাতের আকাশ তারায় ভরে,
জোছনা নামে নদীর জলে,
শরৎ তখন স্বপ্নের মতো
নীরব মনে দোলা দেয়।
সময় বহমান, বদলেছে কত,
পরিবর্তিত জীবনের ধারা,
তবু শরৎ এলে ফিরে আসে
সোনালি স্মৃতির ভিড়।
আজও যখন কাশফুল দোলে,
শিউলি ঝরে ভোরে,
মনে হয় সেই শৈশবের আমি
দাঁড়িয়ে আছি পথের ধারে।
শরৎ মানে নীল আকাশ,
সাদা মেঘের ভেলা,
শরৎ মানে কাশফুলের হাসি,
নদীর বুকে রোদের খেলা।
শরৎ মানে শিউলির সুবাস,
শিশিরভেজা প্রভাত,
শরৎ মানে ধানের গন্ধ,
বাংলার মাটির প্রাণ।
শরৎ মানে মায়ের আগমন,
ঢাকের মধুর সুর,
শরৎ মানে বিজয়ার অশ্রু,
ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা।
শরৎ মানে শৈশবের
হারিয়ে যাওয়া সুখ,
বয়স বাড়ে, সময় বয়ে যায়—
স্মৃতি থাকে হৃদয়ের গভীরে।
তাই সকল ঋতুর ভিড়ে
শরৎ আমার সর্বাধিক আপন,
প্রকৃতি,পূজা-শৈশব মিলিয়ে
শরৎ আমার চিরন্তন স্বপ্ন।
— নির্মল ভৌমিক চাষীবন্ধু
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন