আমার শিকড়ের গান
আমার শিকড়ের গান
কবিতার পাতায় আঁকি আমার
মাটির ছবি, হৃদয়ের গান—
যে গান বাজে পল্লীর বাঁশিতে।
এখানে আছে পায়েসের ঘ্রাণ,
আছে নকশী কাঁথার সেলাই,
আছে বৈশাখের প্রথম রোদে
রাঙা মেয়ের লালপাড় শাড়ি।
আছে নদীর কূল ভাঙা কান্না,
আছে ফসলের মাঠে হাসি,
আর আছে হাজার বছরের
লালন করা একটা জাতির পরিচয়।
এই আমার বাংলাদেশ।
যার সকালে ঘুম ভাঙে আজানের ধ্বনিতে,
আর রাতে ঘুমায় কীর্তনের সুরে।
যেখানে মসজিদের পাশে মন্দির,
মন্দিরের পাশে গির্জা,
আর সবাই মিলে বলে—“আমরা মানুষ”।
জানো, আমার সংস্কৃতি মানে কী?
সংস্কৃতি মানে পহেলা বৈশাখে হালখাতার মিষ্টি,
মঙ্গল শোভাযাত্রার বিশাল মুখোশ,
ইলিশ-পান্তা খেয়ে বলা—
“নতুন বছর ভালো কাটুক”।
সংস্কৃতি মানে ২১শে ফেব্রুয়ারির ভোরে
খালি পায়ে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া,
“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো”
গাইতে গাইতে চোখ ভেজা।
সংস্কৃতি মানে বিজয়ের ১৬ই ডিসেম্বরে
লাল-সবুজ পতাকা হাতে শিশুর দৌড়।
আমার সংস্কৃতি মানে নদী।
পদ্মা, মেঘনা, যমুনা—তিন বোনের মতো
জড়িয়ে আছে দেশটাকে।
নদীর পাড়ে জন্ম নেয় জেলে, মাঝি, কবি।
নৌকা বাইচের সময় “হেইও” শব্দে
কেঁপে ওঠে দুই পাড়।
বর্ষায় নদী ভাঙে,
আবার বুক পেতে ফসলও দেয়।
এই নদীই শিখিয়েছে আমাদের—
ভাঙবি, আবার গড়বি।
আমার সংস্কৃতি মানে মাঠ।
ধান কাটার মৌসুমে কৃষকের কপালের ঘাম,
গরুর গাড়ির চাকার শব্দ,
সন্ধ্যায় রাখালের বাঁশি আর গোধূলির ধুলো।
পিঠা-পুলির উৎসব, শীতের রাতে খেজুরের রস,
আর নতুন ধানের গন্ধে ভরা নবান্ন।
আমরা শহরে এসি রুমে বসে ভুলে যাই—
এই মাটির জন্যই আমাদের পেটে ভাত।
আমার সংস্কৃতি মানে লোকগান।
লালনের “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি”,
হাসনের “নদীয়া কেন বাঁকা”,
ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, জারি, সারি।
এই গানে আছে বিরহ, আছে প্রেম, আছে প্রতিবাদ।
ঢাকের তালে বাউল নাচে, দরবেশ গায়—
“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি”।
আমার সংস্কৃতি মানে উৎসব।
ঈদে সেমাইয়ের প্লেট হাতে নিয়ে
পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়ি যাওয়া।
পূজায় নতুন জামা পরে প্রতিমা দেখা।
বড়দিনে কেক কাটা।
বৌদ্ধ পূর্ণিমায় ফানুস ওড়ানো।
ধর্ম আলাদা, কিন্তু উৎসব সবার।
এই মিলনটাই তো বাংলাদেশ।
আমার সংস্কৃতি মানে খাবার।
সকালের গরম গরম পরোটা-ডাল-ভাজি,
দুপুরে ভাত-মাছ-ভর্তা-ডাল,
রাতে মায়ের হাতের পাতলা খিচুড়ি।
বিকেলে চায়ের সাথে গরম গরম সিঙ্গারা।
বিয়ে বাড়ির কাচ্চি, রোযার ইফতারে জিলাপি-পিয়াজু।
বিদেশে গিয়ে আমরা যে জিনিসটার জন্য সবচেয়ে কাঁদি,
সেটা হলো মায়ের হাতের রান্না।
আমার সংস্কৃতি মানে ভাষা।
“মা” ডাকটা পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর শব্দ।
আমরা রক্ত দিয়ে এই ভাষা কিনেছি।
তাই আমরা বাংলা বলতে লজ্জা পাই না।
আমরা ইংরেজির সাথে বাংলা মিশিয়ে “বাংলিশ” বলি,
কিন্তু গর্ব করে বলি—“আমি বাঙালি”।
কিন্তু ভাই, এই সংস্কৃতি আজ হুমকির মুখে।
আমরা বিদেশি কালচারের নামে নিজের শিকড় ভুলে যাচ্ছি।
বৈশাখে মেয়েরা শাড়ি পরে, কিন্তু স্ট্যাটাস দেয় বিদেশি ব্র্যান্ডের।
আমরা কোরিয়ান সিরিয়াল দেখি, কিন্তু লালনের গান শুনি না।
আমরা পিজ্জা-বার্গার খাই, কিন্তু পান্তা-ইলিশকে “গেয়ো” বলি।
আমরা ফেসবুকে “কালচার বাঁচাও” লিখি,
আর নিজের সন্তানকে বাংলা কবিতা শেখাই না।
এভাবে চললে ২০ বছর পর আমাদের নাতি-নাতনিরা জিজ্ঞেস করবে—
“দাদু, নকশী কাঁথা কী?”
“দাদু, বাউল কারা?”
“দাদু, তোমরা বৈশাখ কিভাবে পালন করতে?”
উত্তর দেওয়ার মতো কিছু থাকবে না।
তাই আসো, সংস্কৃতি বাঁচাই।
নিজের সন্তানকে প্রথমে “আম্মু-আব্বু” শেখাই।
ঘরে রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দের বই রাখি।
বছরে একবার হলেও গ্রামে যাই, মাটির ঘ্রাণ নিই।
পহেলা বৈশাখে শুধু ছবি না,
মন থেকেও পালন করি।
বিদেশি যা ভালো সেটা নিই,
কিন্তু নিজেরটা ছাড়ি না।
সংস্কৃতি মানে পুরনোকে আঁকড়ে থাকা না।
সংস্কৃতি মানে পুরনোকে নতুন করে বাঁচানো।
আমরা জিন্স পরব, সাথে লালপাড় শাড়িও পরব।
আমরা রক মিউজিক শুনব,
সাথে ভাটিয়ালিও শুনব।
আমরা আধুনিক হব,
কিন্তু শিকড় ভুলব না।
কারণ শিকড় ছাড়া গাছ বাঁচে না।
আর সংস্কৃতি ছাড়া জাতি বাঁচে না।
এই দেশটা শুধু ভূখণ্ড না।
এই দেশটা একটা অনুভূতি।
এই দেশটা একটা গান।
এই দেশটা একটা কবিতা।
যার প্রতি লাইনে আছে ত্যাগ,
আছে ভালোবাসা, আছে গর্ব।
তাই আজ শপথ করি।
বাংলা বলব, বাংলা লিখব,
বাংলা নিয়ে গর্ব করব।
নিজের সংস্কৃতিকে ছোট করব না, বড় করব।
পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে বলব—
“আমি বাংলাদেশি।
আমার একটা হাজার বছরের সংস্কৃতি আছে।”
পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছে যাক
এই কবিতার উষ্ণ আহ্বান।
স্বপ্নেরা উড়ুক। কল্পনা হোক।
কবিতার মাঝে বেঁচে থাকুক
আমার প্রাণের বাংলাদেশ।
সবুজ-শ্যামল, নদী-নালা,
গান-গল্পের বাংলাদেশ।
আমার মায়ের বাংলাদেশ।
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন
নিজের লেখা কোথাও দেখলে অনেক আনন্দ লাগে যা কখনো কাউকে বলে বুঝানো যায় না