অভাগিনী
জামিনুর ইসলাম
আশ্বিনের এক ঝোড়ো রাতে কুসুমের জন্ম। গ্রামের ভাঙা টিনের চালে বৃষ্টির উন্মাদনা, আর ঘরের ভেতর প্রদীপের ক্ষীণ আলোয় এক জীবনের অবসান। কুসুম যখন প্রথম কেঁদে উঠল, ঠিক সেই মুহূর্তেই তার মা শেষনিশ্বাস ত্যাগ করলেন। দাইমা শিশুটিকে কাপড়ে জড়িয়ে যখন দাওয়ায় আনলেন, কুসুমের বাবা হাশেম মিয়া তখন পাথরের মতো বসে ছিলেন। মেয়ের মুখ দেখে তিনি আনন্দিত হতে পারলেন না; বরং তাঁর মনে হলো, এই শিশুটি যেন তাঁর ঘর অন্ধকার করে দিয়ে এল। পাড়াপড়শিরা আড়ালে ফিসফাস শুরু করল— “মেয়েটা অপয়া, জন্মের সাথে সাথেই মাকে খেল।” সেই শৈশব থেকেই কুসুমের নামের সাথে আঠার মতো লেগে রইল ‘অভাগিনী’ তকমাটি।
বড় হওয়ার পথটা কুসুমের জন্য সহজ ছিল না। বাবা তাকে দুবেলা খেতে দিলেও কোনোদিন মাথায় হাত রেখে আদর করেননি। গ্রামের স্কুলে যখন সে যেত, অন্য মেয়েরা তাকে এড়িয়ে চলত। কোনো উৎসবে বা বিয়ের অনুষ্ঠানে কুসুমকে ডাকা হতো না, পাছে তার ছোঁয়ায় কারো অমঙ্গল হয়। কুসুমের বন্ধু ছিল কেবল পুকুরপাড়ের হিজল গাছ আর গোধূলির লাল আকাশ। সে একা একা বসে ভাবত, তার দোষটা আসলে কোথায়? সমাজ তাকে যে বিষাক্ত দৃষ্টিতে দেখত, তা ছোট মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল। তবুও কুসুম শান্ত মনে সব সয়ে যেত; হয়তো সে জানত— ধৈর্যই তার একমাত্র শক্তি।
আঠারো বছর বয়সে কুসুমের বিয়ে হলো পাশের গ্রামের রহমত মিয়ার সাথে। রহমত মিয়ার প্রথম স্ত্রী মারা গিয়েছিল, ঘরে দুটি ছোট সন্তান। কুসুম ভেবেছিল, হয়তো এই নতুন সংসারে তার ভাগ্য ফিরবে। সে প্রাণপণে রহমতের সেবা করল, সৎ সন্তানদের নিজের নাড়িছেঁড়া ধনের মতো আগলে রাখল। কিন্তু নিয়তি ছিল নিষ্ঠুর। বিয়ের মাত্র চার মাস যেতে না যেতেই রহমত মিয়া এক ভয়াবহ নৌকাডুবিতে মারা গেলেন। এই সংবাদে কুসুমের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। কিন্তু শোক করার সময়টুকুও সমাজ তাকে দিল না। তার শাশুড়ি চিৎকার করে গ্রাম মাথায় তুললেন, “ডাইনি মেয়ে! আমার জোয়ান ছেলেটাকে খেয়ে ফেলল! ও পা রাখতেই আমার সংসার মরুভূমি হয়ে গেল।” কুসুমকে সাদা শাড়ি পরিয়ে একবেলা ভাতের ব্যবস্থা করে এক কোণায় ফেলে রাখা হলো। দিনের পর দিন গালমন্দ আর অভাবের সাথে লড়াই করে সে বুঝল, এই ভিটায় তার ঠাঁই আর হবে না।
এক গভীর রাতে, যখন পুরো গ্রাম ঘুমে আচ্ছন্ন, কুসুম শুধু পরনের একখানা শাড়ি নিয়ে নিঃশব্দে ঘর ছাড়ল। অজানার উদ্দেশে বাসে চড়ে সে পৌঁছাল ঢাকা শহরে। গগনচুম্বী দালান আর মানুষের যান্ত্রিক ভিড়ে সে নিজেকে খুব অসহায় বোধ করল। ঠাঁই হলো রেললাইনের পাশের এক ঘিঞ্জি বস্তিতে। শুরু হলো বেঁচে থাকার নতুন সংগ্রাম। মানুষের বাসায় থালাবাসন মাজা আর কাপড় ধোয়ার কাজ নিল সে। কিন্তু সেখানেও শান্তি নেই; গৃহকর্ত্রীর কড়া কথা আর সমাজের বাঁকা নজর তাকে সবসময় তাড়া করে বেড়াত। তবুও কুসুম দমল না। সে ঠিক করল, নামটা তার ‘অভাগিনী’ হতে পারে, কিন্তু ভাগ্যটা সে নিজের পরিশ্রম দিয়েই গড়বে।
বস্তির পাশেই একটি ছোট হস্তশিল্পের কেন্দ্র ছিল, যেখানে পাড়ার মেয়েরা নকশিকাঁথা আর শাড়ি বুনত। কাজের ফাঁকে কুসুম সেখানে গিয়ে বসে থাকত। একদিন এক টুকরো ফেলে দেওয়া কাপড়ে সে নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে একটি সূর্যাস্তের দৃশ্য ফুটিয়ে তুলল। কেন্দ্রটির দায়িত্বে থাকা ভদ্রমহিলা কুসুমের হাতের কাজ দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি বললেন, “কুসুম, তোমার হাতে তো জাদু আছে!” সেই শুরু। কুসুম প্রশিক্ষণ নিল। সুঁই আর সুতার প্রতিটি ফোঁড়ে সে নিজের জীবনের সব হাহাকার, সব লাঞ্ছনা আর না-বলা কথাগুলো রঙের ছোঁয়ায় বুনে দিতে লাগল। তার তৈরি নকশাগুলো এতটাই শৈল্পিক ছিল যে, শহরের নামী-দামি ফ্যাশন হাউসগুলো সেগুলো কেনার জন্য ভিড় জমাল। কুসুম বুঝল, তার এই সৃজনশীলতাই হবে তার নতুন পরিচয়। সে নিজের জমানো টাকায় ছোট একটি ঘর ভাড়া নিয়ে আরও পাঁচজন অসহায় নারীকে সাথে নিয়ে নিজস্ব একটি উদ্যোগ শুরু করল।
দশ বছর পর। কুসুম এখন আর সেই ভীরু মেয়েটি নেই। সে এখন একটি বড় বুটিক হাউসের সফল মালিক। তার অধীনে এখন কাজ করে শত শত অবহেলিত নারী, যাদের প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে সমাজের কাছে লাঞ্ছিত ছিল। একদিন সে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে নিজের গ্রামে ফিরল। যে রাস্তা দিয়ে তাকে ‘অপয়া’ বলে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই রাস্তা দিয়েই সে বীরের বেশে ফিরল। গ্রামের মানুষ অবাক হয়ে দেখল, কুসুমের হাত দিয়েই আজ পুরো গ্রাম বদলে যাচ্ছে। সে তার বাবার পুরনো ভিটায় একটি স্কুল আর মহিলাদের জন্য সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলল। যিনি তাকে ‘ডাইনি’ বলেছিলেন, সেই শাশুড়ি আজ বয়সের ভারে ন্যুব্জ আর একা; কুসুম তাকে সসম্মানে নিজের কাছে নিয়ে এল। গ্রামের লোকজন আজ আর তাকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নেয় না, বরং শ্রদ্ধায় মাথা নত করে।
গল্পের শেষে একদিন গোধূলি বেলায় কুসুম যখন সেই পুরনো পুকুরপাড়ে গিয়ে দাঁড়াল, আকাশটা আজকেও লাল হয়ে ছিল। তবে আজকের লাল রংটা কষ্টের নয়, বরং বিজয়ের। কুসুম নিজের মনেই হাসল। সে প্রমাণ করে দিয়েছে যে, সমাজ কাউকে ‘অভাগিনী’ বললেই সে হার মেনে নেয় না; মনের জোর আর সঠিক লক্ষ্য থাকলে অন্ধকার আকাশেও সাফল্যের নতুন সূর্য উদয় করা সম্ভব।
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন