• রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০১ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
কালীগঞ্জে ১২ বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও গর্ভপাতের অভিযোগ, আটক ৩ মাদক বিরোধী অভিযানে মাদক কারবারি আটক করে থানায় আসার সময় এস আই সহ নিহত ২ আহত ২ জন মোঃ মুক্তাদির হোসেন, বাংলাদেশ কবিতা সংসদের সাহিত্য সম্মেলন প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত কবিতা: সমাজের আয়না সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়েই আমরা এ সমাজে বসবাস করি: ফজলুল হক মিলন এমপি দুর্গাপূজার মণ্ডপে মণ্ডপে এমপি মিলন, দিলেন পাশে থাকার আশ্বাস তুমুলিয়া ইউনিয়নের ইতিহাসে প্রথম নারী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শিখা বেগম কবিতা:মায়ার পৃথিবী, সত্যের স্রষ্টা — একটি আত্মোপলব্ধির কবিতা রচনায়: মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম তারিখ:১৬/১০/২০২৬ স্বী স্ত্রীর রমীমা মাদক ব্যবসা কালীগঞ্জে ১ কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তার ১, কালীগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ীদের উদ্যেগে ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত

শহীদ আবু সাঈদ ✍️ রচনা: মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺 তারিখ:২২/০৬/২০২৫

বাংলার কথা ডেস্ক / ১৪০ বার পঠিত
আপডেটঃ বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬

শহীদ আবু সাঈদ

✍️ রচনা: মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺

তারিখ:২২/০৬/২০২৫

 

পীরগঞ্জ উপজেলার নিভৃত পল্লী বাবনপুর—সবুজ ধানের মাঠ, কাঁচা রাস্তাঘাট, সরষে ফুলের হলুদ মাধুরী আর শিশিরভেজা সকালের নরম আলোয় স্নিগ্ধ এক গ্রাম। এখানেই ২০০১ সালের এক ভোরে জন্ম নিয়েছিলেন আবু সাঈদ। তিনি ছিলেন মকবুল হোসেন ও মনোয়ারা বেগমের কনিষ্ঠ সন্তান। ছয় ভাই ও তিন বোনের সংসারে তিনি যেন ছিলেন আলোকবর্তিকা—মায়ায় মোড়া এক কিশোর, যার চোখে ছিল স্বপ্ন আর হৃদয়ে ছিল দৃঢ়তা।

শৈশব কাটে গ্রামের মাঠেঘাটে, নদীর পাড়ে আর স্কুলের বেঞ্চিতে। বাবনপুরের জাফর পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই ছিল তার মেধার পরিচয়। পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি পেয়ে সকলের দৃষ্টি কাড়েন। এরপর ভর্তি হন খালাশপীর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে। দরিদ্র পরিবার, কিন্তু মন থেকে ধনী ছিল আবু সাঈদ। নিজের বই নিজেই রোদে শুকিয়ে রাখতেন, পুরোনো খাতায় টানতেন নতুন অক্ষরের রেখা। এসএসসিতে পান গোল্ডেন জিপিএ-৫।

অভাব সত্ত্বেও পরিবারের কেউ তাকে পড়ালেখায় বাধা দেয়নি। মায়ের শাড়ির আঁচল বিক্রি হয়েছে, বাবার জমির ফসল বন্ধক পড়েছে—তবু সাঈদের মুখে কখনো বিরক্তির ছায়া দেখা যায়নি। ২০১৮ সালে রংপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি তে আবারো জিপিএ-৫ অর্জন করেন।

২০২০ সালে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। ভর্তি হওয়ার দিনটি আজও রংপুর শহরের আকাশে লেখা আছে। গ্রামের ছেলে শহরের আলোয় এসেছেন, হাতে বই, চোখে স্বপ্ন আর অন্তরে দায়িত্ব—নিজের জন্য নয়, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি একজন সৎ, নিরহংকার, মেধাবী ও মানবিক শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

কোটা সংস্কার আন্দোলন ও আবু সাঈদের ভূমিকা

বাংলাদেশের মেধাবী তরুণদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল কোটা পদ্ধতির সংস্কার। সরকারি চাকরিতে অযৌক্তিকভাবে সংরক্ষিত কোটা বাতিল করে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের দাবি জানিয়ে শুরু হয় ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’। সাঈদ ছিলেন এই আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। প্যাঁচানো রাজনীতির অরণ্যে যখন সবাই গুটিয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি দাঁড়িয়েছিলেন মুষ্টিবদ্ধ হাতে, প্রতিবাদী চেহারায়।

তিনি শুধু স্লোগান দেননি—তিনি পথ দেখিয়েছেন, সহপাঠীদের উদ্বুদ্ধ করেছেন, আন্দোলনের পোস্টার বানিয়েছেন, নিঃশব্দে কান্না শুনেছেন নির্যাতিতদের, আর নিজের হৃদয়ের টানে লড়েছেন।

 

 

সেই ভয়াল দিন:১৬ জুলাই, ২০২৪ তারিখ

 

 

সেদিন ছিল ১৬ জুলাই, ২০২৪ তারিখ । রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনের ঢেউ উঠেছিল। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে জড়ো হয়েছিল শত শত শিক্ষার্থী। তারা শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করছিল। হঠাৎই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ ছত্রভঙ্গ করতে শুরু করে। টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট, লাঠিচার্জ—সেই দৃশ্য যেন ১৯৫২ বা ৭১-এর ইতিহাসকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল।

তখনই, এক মুহূর্তে আচমকা ঘটে যায় সব। পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়েন আবু সাঈদ। রক্তাক্ত মুখ, নিথর শরীর—সবকিছু যেন স্তব্ধ করে দিয়েছিল সময়কে। পুরো ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে কান্না। সাঈদের মুখ তখনো শান্ত, তবুও সে চিরতরে ঘুমিয়ে পড়েছে।

 

 

শেষ বিদায়ের শোকাবহ দৃশ্য

 

 

তার মরদেহ যখন বাবনপুরে আনা হয়, তখন পুরো গ্রাম নেমে আসে পথে। বারান্দায় এক তরুণী বুক চাপড়ে কাঁদছেন—সাঈদের বোন। পাশে বৃদ্ধা মা মনোয়ারা বেগম আহাজারি করছেন:

‘মোর সোনার বাবাটাক পুলিশ গুলি করিয়া মারল ক্যান? ও তো কাউরে মারতে যায় নাই! চাকরি চাওয়াটা কি অপরাধ?’

আরেক পাশে সাঈদের বোন বিলাপ করছিলেন:

‘ও ভাই, তুই হামাক ভাসে থুইয়া কোনটে হারে গেলু? তুই তো কচলু বইন, মুই চাকরি করলে অভাব থাইকপের না। তুই কত কষ্টে প্রাইভেট পড়াইয়া টাকা পাঠাইছিলু।’

এই শব্দগুলো কোনো নাটকের সংলাপ নয়। এগুলো ইতিহাসের রক্তাক্ত অধ্যায়।

এই কথা গুলো পত্রিকার পাতায় এক সাংবাদিক ভাইয়ের লেখা থেকে জানতে পারি।

আন্দোলনের সফলতা ও প্রজন্মের শ্রদ্ধা

সাঈদের মৃত্যুর পরে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। সারাদেশে ছাত্ররা জেগে ওঠে। মোমবাতি মিছিল, কালো ব্যাজ, মানববন্ধন—সব জায়গায় উচ্চারিত হতে থাকে একটি নাম—আবু সাঈদ। সবাই বলতে থাকে, “এই শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া হবে না।”

অবশেষে সরকার কোটা সংস্কারে বাধ্য হয়। অনেক ক্ষেত্রে কোটা সীমিত করা হয়, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধার গুরুত্ব বাড়ে। এই জয় শুধু একটি আইনি জয়ের নাম নয়—এটি শহীদ সাঈদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত জয়।

একটি প্রশ্ন

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—কেন একজন দরিদ্র ঘরের, মেধাবী ছাত্র, যার স্বপ্ন ছিল মায়ের মুখে হাসি ফোটানো, তাকে গুলিবিদ্ধ হতে হলো? কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমরা দিতে পারি না, কিন্তু ইতিহাস একদিন দেবে।

 

পরিশিষ্ট

আজ আবু সাঈদের কবরের পাশে দাঁড়ালে পাখির ডাকে, বাতাসের ধাক্কায়, গাছের পাতার কাঁপনেও যেন একটা শব্দ শোনা যায়—

“আমি শহীদ হয়েছি, যেন অন্যদের আর শহীদ হতে না হয়। আমি মরে গিয়ে বলেছি—মেধার কদর চাই।”

আবু সাঈদ আর নেই, কিন্তু তিনি হয়ে আছেন প্রজন্মের প্রতীকে, প্রতিবাদের অনলে, আদর্শের বাতিঘরে। তিনি শহীদ আবু সাঈদ—প্রজন্মের বীর, একটি স্বপ্নের নাম, একটি আন্দোলনের ইতিহাস।

ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

আল্লাহ যেন শহীদ আবু সাঈদকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন। আমিন।

Copyright and all rights reserved by author.


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন