শেষ চিঠির ওপারে”
নাজনীন শামীম
— পর্ব ৩৩
যে নামটি নিজের ছিল না
“কখনো কখনো সবচেয়ে ভয়ংকর মিথ্যেটা বলা হয় নিজের পরিচয় দিয়ে—
আর সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যটা লুকিয়ে থাকে অন্যের নামে।”
মেহরীন ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
“মেহরীন, আমি তোমার বাবা।”
একটা বাক্য।
অথচ সেই বাক্যই যেন পাঁচ বছরের সব স্মৃতিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।
মায়া ধীরে বলল—
—বার্তাটা দেখাও।
মেহরীন ফোনটা এগিয়ে দিল।
M-2 বার্তাটা পড়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর বলল—
—এটা আরিয়ানের নম্বর?
—হ্যাঁ।
—তাহলে আরিয়ান তোমার বাবা?
মেহরীন তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।
—অসম্ভব।
M-2 শান্ত গলায় বলল—
—অসম্ভব কথাটা এই গল্পে সবচেয়ে বিপজ্জনক শব্দ।
মেহরীন কিছু বলল না।
তার ফোন আবার কেঁপে উঠল।
আরেকটা বার্তা।
“ডান হাতের কথা মনে আছে?”
মেহরীনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
এটা সে কাউকে বলেনি।
শুধু তার বাবা জানতেন।
সে কাঁপা হাতে লিখল—
“তুমি কোথায়?”
উত্তর আসতে বেশি সময় লাগল না।
“যেখানে আমাকে শেষবার দেখেছিলে।”
মেহরীনের বুক ধক করে উঠল।
—০৩ নম্বর কক্ষ…
M-2 সঙ্গে সঙ্গে বলল—
—না।
—কেন?
—কারণ কেউ তোমাকে সেখানে টেনে নিতে চাইছে।
মেহরীন এবার রেগে উঠল।
—সবাই শুধু আমাকে থামাচ্ছে! কিন্তু কেউ সত্যিটা বলছে না!
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
—আমার বাবা কোথায়? আরিয়ান কে? ১৭ আগস্ট রাতে কে মারা গিয়েছিল?
ঘর নিস্তব্ধ।
হঠাৎ মায়া ধীরে বলল—
—তুমি সত্যিই সব জানতে চাও?
—হ্যাঁ।
—যদি সত্যিটা তোমার নিজের পরিচয় বদলে দেয়?
মেহরীন থেমে গেল।
—মানে?
মায়া টেবিলের নিচ থেকে একটি পুরোনো ফাইল বের করল।
ফাইলের ওপর লেখা—
M-00 / SUBJECT: 04
মেহরীনের চোখ আটকে গেল।
—Subject 04… আমি?
মায়া কোনো উত্তর দিল না।
M-2 ফাইলটা বন্ধ করতে গেল।
মেহরীন তার হাত সরিয়ে দিল।
ভেতরে ছিল একটি পুরোনো হাসপাতাল রিপোর্ট।
নাম লেখা—
মেহরীন রহমান।
তার নিচে বয়স।
তারিখ।
তারপর একটি লাল সিল—
IDENTITY TRANSFERRED
মেহরীনের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
—Identity transferred… এর মানে কী?
M-2 এবার প্রথমবারের মতো চোখ নামিয়ে ফেলল।
—তোমার নামটা তোমার ছিল না।
—তাহলে আমার আসল নাম কী?
কেউ উত্তর দিল না।
মেহরীন ফাইলের শেষ পাতাটা উল্টাল।
সেখানে একটি ছোট ছবি আটকানো।
ছবিতে একজন কিশোরী।
মুখটা মেহরীনের মতো।
কিন্তু নিচে লেখা নাম—
মায়া রহমান।
মেহরীন ধীরে ধীরে মায়ার দিকে তাকাল।
মায়ার চোখে তখন জল।
—তুমি… মায়া?
মায়া মাথা নিচু করল।
—আমি যে মায়াকে তুমি পাঁচ বছর ধরে চিনে এসেছ…
সে থেমে গেল।
—সে আসলে তোমার বোন ছিল।
মেহরীনের শরীর অবশ হয়ে গেল।
—ছিল?
মায়া চোখ তুলে তাকাল।
—হ্যাঁ।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে দরজায় তিনবার টোকা পড়ল।
টক।
টক।
টক।
তারপর সেই পরিচিত কণ্ঠ—
—মেহরীন, দরজা খোলো।
কণ্ঠটা এবার একেবারে পরিষ্কার।
মায়া হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।
তার মুখের রং বদলে গেছে।
—এই কণ্ঠ…
মেহরীন তাকাল।
—চেনো?
মায়া ফিসফিস করে বলল—
—হ্যাঁ।
এক মুহূর্ত থেমে—
—এই কণ্ঠটা তোমার বাবার নয়।
মেহরীনের বুক কেঁপে উঠল।
—তাহলে কার?
মায়া দরজার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করল—
—তোমার।
চলবে…
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন