• রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৫ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
কালীগঞ্জে ১২ বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও গর্ভপাতের অভিযোগ, আটক ৩ মাদক বিরোধী অভিযানে মাদক কারবারি আটক করে থানায় আসার সময় এস আই সহ নিহত ২ আহত ২ জন মোঃ মুক্তাদির হোসেন, বাংলাদেশ কবিতা সংসদের সাহিত্য সম্মেলন প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত কবিতা: সমাজের আয়না সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়েই আমরা এ সমাজে বসবাস করি: ফজলুল হক মিলন এমপি দুর্গাপূজার মণ্ডপে মণ্ডপে এমপি মিলন, দিলেন পাশে থাকার আশ্বাস তুমুলিয়া ইউনিয়নের ইতিহাসে প্রথম নারী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শিখা বেগম কবিতা:মায়ার পৃথিবী, সত্যের স্রষ্টা — একটি আত্মোপলব্ধির কবিতা রচনায়: মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম তারিখ:১৬/১০/২০২৬ স্বী স্ত্রীর রমীমা মাদক ব্যবসা কালীগঞ্জে ১ কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তার ১, কালীগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ীদের উদ্যেগে ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত

গল্পঃ কামলা, লেখকঃ জামিনুর ইসলাম। দৈনিক বাংলার কথা।

বাংলার কথা ডেস্ক / ৭১ বার পঠিত
আপডেটঃ মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কামলা
জামিনুর ইসলাম

​সকালের সূর্যটা তখনো ভালো করে ওঠেনি, তার আগেই করিম মিয়ার চোখ মেলে গেছে। মেসের এক কোণে পুরোনো কাঁথাটা গুটিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ায় সে। পেশায় সে একজন দিনমজুর, গ্রামের মানুষ যাকে সংক্ষেপে বলে ‘কামলা’। কিন্তু এই একুশ শতকের ডিজিটাল যুগে এসেই করিম মিয়ার জীবনের সমীকরণগুলো যেন কেমন বদলে গেছে।
​আজকাল আর মোড়ের মাথার হাটে হাতে কোদাল আর ঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে কাজ মেলে না। মানুষের দরকার এখন ‘টেকনিক্যাল কামলা’। করিম মিয়া শিক্ষিত না হলেও পেটের দায়ে অনলাইন ডেলিভারি বয়ের কাজ নিয়েছে। একটা জীর্ণ মোটরবাইক আর পিঠে বিশাল এক লাল ব্যাগ—এটাই এখন তার কোদাল-ঝুড়ি। মানুষ তাকে আর মেঠোপথের মজুর বলে না, বলে ‘ডেলিভারি বয়’। তবে করিম মিয়ার কাছে নামটা বদলালেও পেটের ক্ষুধা আর হাড়ভাঙা খাটুনি একই রয়ে গেছে।
​সকাল থেকেই শুরু হয় অ্যাপসের টুংটাং শব্দ। এক বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে অন্য বাড়ি পৌঁছে দাও, এক দোকানের জিনিস টেনে নিয়ে যাও কোনো চারতলার এসি রুমে। শহরের চকচকে জীবনে আরাম কুড়াতে থাকা মানুষগুলো অ্যাপে একটু দেরি দেখলেই খেঁকিয়ে ওঠে—”এত দেরি কেন ভাই? স্টার রেটিং কমিয়ে দেব!”
​করিম মিয়া মুখে হাসি রেখে বিনীত গলায় বলে, “স্যার, রাস্তায় বড্ড জ্যাম আছিল।” কিন্তু এই হাসির পেছনে চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাসটা কেউ দেখে না। তারা রেটিংয়ের হিসাব বোঝে, ঘামের দাম বোঝে না।
​আজ দুপুরবেলা একটা অভিজাত এলাকার আটতলার ফ্ল্যাটে ডেলিভারি দিতে গেছে সে। খাবার হাতে পেয়ে চশমা পরা এক যুবক করিম মিয়ার দিকে চেয়ে কিছুটা তাচ্ছিল্যের সুরে পাশের অন্য একজনকে বলল, “দেখলে, আজকাল আর কাউকে ক্ষেতে কাজ করতে হয় না, সব অনলাইনে কামলা দিতে চলে এসেছে!”
​কথাটা করিম মিয়ার কানে এসে তীরের মতো বিঁধে। মনে পড়ে যায় গাঁয়ের বুড়ো বাপের কথা। বাপ বলতেন, “কাজ করলে কোনো লজ্জা নাই রে বাপু, যে ঘাম বেচে সেই তো স্বাধীন।” কিন্তু করিম মিয়া ভাবে, আসলেই কি তারা স্বাধীন? আগেকার দিনে জমিদারেরা চাবুক মারত পিঠে, আর এখন আধুনিক সমাজ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বসে মানসিক চাবুক মারে রেটিং আর কমেন্টের মাধ্যমে।
​দিনশেষে পেট চালাতে পাঁচটা স্টার রেটিং আর একটা ভালো রিভিউর ওপর নির্ভর করতে হয় তার রুটিরুজি। ট্রাফিক সিগন্যালে যখন গরম রোদে হেলমেটের নিচে ঘাম জমে চোখ ধোঁয়াটে হয়ে আসে, তখন করিমের মনে হয়—ডিজিটাল বাংলাদেশ হয়েছে, চকচকে বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে, মানুষের জীবন সহজ হয়েছে; কিন্তু তাদের মতো শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যের চাকা সেই একই জায়গায় আটকে আছে। শুধু নামটা ‘কামলা’ থেকে বদলে গেছে ‘ফ্রিডম ওয়ার্কার’ বা ‘ডেলিভারি এজেন্ট’-এ।
​রাতের অন্ধকার ঘন হলে করিম মেসে ফিরে একমুঠো ভাত মুখে দেয়। শরীরে ক্লান্তি চেপে বসে। পরদিন আবার সূর্য ওঠার আগেই অ্যাপ চালু করতে হবে, আবার ছুটতে হবে কারো বিলাসিতা মেটাতে। করিম মিয়া চোখ বুজে ভাবে, প্রযুক্তির এই চমকপ্রদ দুনিয়াতেও আসলে ঘাম বেচা মানুষগুলো চিরকাল কামলাই থেকে গেল।
​বাইরের জানলা দিয়ে শহরের নিওন আলো এসে পড়ে মেসের স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে। বাইরে তখনো ছুটে চলেছে দ্রুতগতির গাড়ি, আলোঝলমলে নগরীর ক্লান্তিহীন যান্ত্রিক জীবন। কিন্তু সেই রঙিন আলোর ছটা করিম মিয়ার মেসের অন্ধকার কোণ পর্যন্ত পৌঁছায় না। সে আলতো করে স্পর্শ করে মুঠোফোনটি, যেখানে ক্ষণে ক্ষণে নোটিফিকেশন আসছে আগামীকালের অর্ডারের।
​মোবাইলটা পাশে রেখে করিম নিজের খসখসে হাতের তালু দুটো মুখের সামনে ধরে। রোদে পোড়া, কেটে যাওয়া চামড়া আর কড়াপড়া আঙুলগুলো যেন কোনো যুগের হিসাব না পাওয়া খাতার পাতা। যুগ বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, নতুন নতুন নাম জুড়ে যায় পরিচয়ের পাশে; কিন্তু এই হাতগুলোর ভাগ্যের রেখা আর বদলায় না। শেষমেশ নিঃশব্দে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে। কাল ভোরে আবার ছুটতে হবে অ্যাপের তাগিদে, যান্ত্রিক এই শহরের অচেনা ইটের খাঁচায় ঘাম আর স্বাচ্ছন্দ্য বেচার নতুন এক লড়াইয়ে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট মোঃ জহির উদ্দীন